Two Deaths: Khan Sarwar Murshid and Bishwajit Das

KSM_BD

একদিকে খান সারওয়ার মুর্শিদ। আরেক দিকে বিশ্বজিৎ দাস। পিঠাপিঠি এই দুটো মৃত্যু যেন স্মরণ করিয়ে দিয়ে গেল গত ৪১ বছরে একটি দেশের ক্রমশ বিবর্তনের পরিক্রমা।
প্রথমজন ৮৮ বছরের বৃদ্ধ – সর্বজন শ্রদ্ধেয় বিদগ্ধ শিক্ষক। তাঁর ছাত্র ছিলেন শামসুর রাহমান, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। জাতির প্রখরতম মেধাগুলো, সংস্কৃতির অন্যতম সৃজনশীল কারিগরেরা যেন প্রফেসর মুর্শিদের হাত ধরে উঠে এসেছেন, তাঁর সান্নিধ্যেই বিচরণ করতেন। শুধু জ্ঞানের বিশালতা  নয় – তাঁর সাহস আর দৃঢ় নীতিবোধ দিয়ে তিনি একেকটি প্রজন্মকে পথ দেখিয়েছিলেন।

১৯৬১ সালে আইয়ুবশাহীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে যখন বাঙালি সাংস্কৃতিক কর্মী আর বুদ্ধিজীবীরা প্রস্তুতি নিলেন রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী পালনের, তাদের নেতৃত্বে ছিলেন উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক, ইংরেজি বিভাগের এই বিনম্র মৃদুভাষী শিক্ষক, খান সারওয়ার মুর্শিদ। ছয় দফা প্রনয়ন থেকে শুরু করে উনসত্তুরের গণআন্দোলন আর একাত্তুরের মুক্তিযুদ্ধ – সবখানে ছিল তাঁর অগ্রণী ভুমিকা। তাঁর সহকর্মী ছিলেন জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, বধ্যভূমির আরেক বলি রশিদুল হাসান।

এই মাটিতে এমন কিছু মানুষ জন্মেছিল বলেই একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। জাতির মেলায় বাঙালির সার্বভৌমত্ম প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল।

তাঁকে একবার দুইবার দেখেছি। তার পরিবারের দুই-একজনের সাথে বন্ধুতার সুত্রে। একইভাবে দূর থেকে দেখেছিলাম প্রফেসর মুর্শিদের মত বাংলাদেশের জন্মদায়ী প্রজন্মের আরেকজন সাহসী সৈনিক-স্কলার প্রফেসর এ আর মল্লিক-কে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা, ভারত আর নেপালে সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রথম দূত, অর্থমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দিনের উত্তরসুরী। ডক্টর মল্লিক মারা গেছেন ১৫ বছর হতে চললো।

যখন এই মানুষগুলোকে চাক্ষুষ দেখেছি, তখন হয়তো বাংলাদেশ সৃষ্টিতে এদের অজেয় অবদান সম্পর্কে বিশেষ অবগত ছিলাম না। পরে পড়ে জেনেছি-বুঝেছি — তার আগে চিনতাম শুধু বন্ধুর পিতামহ হিসাবে। কিন্তু সেই সময়েও মুর্শিদ বা মল্লিক নামের এই বুড়ো দাদুগুলোর ধীশক্তি, প্রজ্ঞা, চারিত্রিক দৃঢ়তা, আর তার চেয়েও বেশি চারিত্রিক মাধুর্য্য – এই বৈশিষ্ট্যগুলো চোখ এড়াতে পারতো না।

***

আমাদের জাতীয় চরিত্র থেকে সেইসব গুণাবলী নিশ্চিতভাবেই বিলীন হয়ে গেছে। কতকাল আগে বাংলাদেশ বদলে গেছে, ঠিক কোন সন্ধিক্ষণে এসে এই মানুষগুলো সমাজের রুল না হয়ে এক্সেপশন হয়ে গেলেন, সেটা আমার জানা নেই। কিন্তু দেশ যে তাদের দর্পণ ছিল না অনেকদিন থেকেই, সেটা বুঝতে সমাজবিদ হতে হয় না।

একদা পাঠানকে তোয়াক্কা না করে যে দেশে উদযাপন হয়েছিল রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী, ২০১২-তে এসে সেদেশে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে খুন হয় হতভাগা দর্জি, আর মৃত্যুন্মুখ যুবককে ঘিরে ঘুরতে থাকে ক্যামেরার ফিল্ম, ভিডিওর রীল। সরকার নির্লিপ্ত, প্রশাসন মূক। হিংস্র হায়েনার দল, দিনের আলোয় চাপাতি-খুনির গ্যাং, তারাই তো দুধে-ভাতে পালেন। প্রফেসর মুর্শিদ যদি আজকে বেঁচে থাকতেন, যদি বিশ্বজিতের কোরবানী দেখে যেতে পারতেন, কি ভাবতেন তিনি?

তাঁদের প্রজন্মের অসীম সাহসিকতা আর গভীরতম মানবিক আদর্শগুলো যে বাংলাদেশ নামের কাপুরুষ রাষ্ট্রটি, বাঙালি নামের নিবীর্য জাতিটি ধারণ করতে পুরোপুরিই ব্যর্থ হলো – সেটা নিয়ে তাঁর কি ভাবনা হতো? তিনি কি মনস্তাপ অনুভব করতেন, লজ্জায় মাথা নোয়াতেন? তিনি কি পেপারের পাতায় ছবি দেখে ভাবতেন – কোথায় সব গড়বড় হয়ে গেল, বিশ্বজিতের আর্তনাদে কি গাঢ় ছন্দপতন হয়ে গেল?

তাঁদের মত মানুষের উত্তরাধিকারী যে আমাদের মত মানুষ – সেই দোষ কি তাঁদের, নাকি সেই ব্যর্থতা আমাদের?

নাকি বরাবরের মতই মুর্শিদ বা মল্লিক-রা আশা দেখে যেতেন প্রগতির, নতুন দিনের, উত্তোরণের?

পিঠাপিঠি দুইদিনে ডক্টর মুর্শিদ আর বিশ্বজিৎ দাসের মৃত্যুসংবাদ দেখে মনে হলো একটি যুগের সমাপ্তি হচ্ছে, একটি আদর্শের কবর দেয়া হলো  – আর তার স্থানে একটি নতুন দেশ, একটি নতুন রাষ্ট্র – যার সাথে একাত্তুরের চেতনার দুর্বলতম সংস্পর্শও কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না – তেমনই একটি দেশ যেন ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s