We must return to class politics

© Demotix

© Demotix

Round-up of various posts on Facebook

From Mirza Taslima on Facebook

“সারের দাবীতে আন্দোলনরত কৃষকের পাশে কি কখনও তাদের দাঁড়াতে দেখেছি আমরা? নাকি তারা পুড়ে যাওয়া গার্মেন্টস শ্রমিকের পরিবারের লড়াইয়ে সামিল হয়েছে?কানশাট ও ফুলবাড়ির কথা না হয় নাই বল্লাম।৪২ বছর ধরে যুদ্ধাপরাধী হয়েও দাপুটে রাজনীতিক সাঈদী কি বাংলাদেশের সমাজে প্রান্তিক? সাঈদী ধর্মের ব্যাখ্যা দিত, আবেগে জনগণকে ভাসিয়ে দিতে পারত হয়তো, কিন্তু গরীব মানুষের কোন মৌলিক বন্ঞনা মোচনে সাঈদীর বা তার দল তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে?

From Sayeed Ferdous on FB
অন্যদিকে সরকার পক্ষ শাহবাগের মঞ্চকে বাগে রাখতে গিয়ে বারংবার শাহবাগের সার্বজনীন চরিত্রকে বিপন্ন করেছে। তারা ভুলে গেছে, তারা ভুলে যায় আওয়ামী লীগের ডাকে এখানে মানুষ জড়ো হয়নি; আওয়ামী এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্যে মানুষ আসেনি। এই জমায়েতের স্পিরিটে আঘাত করা, তার সার্বজনীনতাকে নষ্ট করা এবং নিজেদের মোড়লগিরি দেখানোর মধ্য দিয়ে সরকার এই আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্থ করছে।

From Aaditya Das on Facebook
আওয়ামী আধুনিকরা ব্যবহার করছে শাহবাগে জড়ো হওয়া জমায়েতকে । আর জামাতিরা এর বাইরে পড়ে থাকা ধর্মদাড়ি আধুনিক-অনাধুনিক তরুণ এবং কৃষককে ব্যবহার করছে ।.. শহরে বসে বসে আধুনিক যুক্তিবিদ্যার বাহাদুরি দিয়ে;মিডিয়া-পুলিশ-মধ্যবিত্ত পরিসরকে বাংলাদেশ ভেবে, যারা এই সব অনাধুনিক মানুষগুলোকে জঙ্গি জামাতি ভেবে গালাগালি করছেন । সন্ত্রাসি বলে অন্যায্য রাষ্ট্রকে লেলিয়ে দিচ্ছেন । তত্ত্ব ফেরি করছেন । তারা গণবিরোধী জামাতের সাপোটার বাড়ানোই শুধু নয়, সাধারন মানুষকে খুন করার বৈধতাও তৈয়ার করছেন;অন্যায্য রাষ্ট্রের তরফে ।
From “Bangali” on Facebook:শাহবাগের ছোয়ায় নব্যবিপ্লবী, অতি-বিপ্লবী আর ৪ বছর কোনঠাসা থাকা চুপা গদি-বিপ্লবীরা হঠাত নিজেদের এক কাতারে নিয়া আসতে পার্সে। এতদিন যাদের দেখা যাইত গান শেয়ার করতে, দেশের শীত-গ্রীষ্ম-শরতে ৯গ্যাগ মশকরা আর ফার্মভিল খেলতে- রাজনীতির কথা শুনলে যারা বলতো ‘আই হেইট দিস শিট’— তারাই আজকে জাইগা উঠসে। পত্রপত্রিকা মারফত তারা জানতে পার্সে দেশে এখন বসন্ত। এদের বোধে ধাক্কা না দিতেই শাহবাগের মঞ্চ অরাজনৈতিক ভোল ধরে। কিন্তু তারা সরকাররে ভয় পায়। ছোট সরকার, বড় সরকার- সবাইরেই ভয়। কাউরে কিছু জিগায় না, একান্ত অনুগত আন্দোলন। বিচার নিয়া প্রশ্ন করলে যদি সরকার পড়ে যায়? প্রসিকিউশনে লোকবল বাড়াইতে চাপ দিলে যদি সরকার বেকে বসে? ৭১ এর পাকি পক্ষ নেয়া দলগলো নিষিদ্ধ করতে চাপ দিলে আপায় কি মাইন্ড করবে? মিয়া, সরকার কি কুল বরই যে গোড়ায় ঝাকি দিলেই টপাটপ পড়ে যাবে? চার বছরের কম ঝাকানো হয় নাই পদ্মা সেতু-কুইক রেন্টাল-হলমার্ক- শেয়ার মার্কেট নিয়া। পড়সে? দাবি আদায়ের আন্দোলনে সরকারের প্রতি এত সংবেদনশীল লাজুকলতা হইলে ক্যামনে হবে?From Faruk Wasif on facebook:একাত্তরের অ্যান্টিথিসিসকে জয় পেতে হলে জাতীয় ইতিহাসের জায়গায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে জামাতি ইতিহাস। জনমনে প্রোথিত চেতনাধারাকে খারিজ করতে হবে দলীয় বাগধারা দিয়ে। সেই বাগধারায় ২০১৩র জামাতি গণ্ডগোল হবে ‌’গণহত্যা’ আর একাত্তরের গণহত্যা হবে ‌’গণ্ডগোল’। মুক্তিযুদ্ধ হবে ‌’গৃহযুদ্ধ’, স্বাধীনতা হবে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’। মুক্তিযোদ্ধারা হবেন ‘গাদ্দার’ আর রাজাকার হবে স্বাধীনতার সৈনিক। অসাম্প্রদায়িকতা বর্ণিত হবে হিন্দুয়ানি বলে। হিন্দুদের বাংলাদেশি বাঙালি না বলে বলতে হবে ‘ভারতের দালাল’। বাংলাদেশ ও এর জনগণের সার্বভৌমত্বের আকাংখা নাজায়েজ হবে। সহিংসতা দমনে রাষ্ট্রের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের বিরোধিতা করতে ‘গণহত্যা’ কথাটা কেন আনতে হলো তাদের, এই সূত্রে তা পরিষ্কার হবে। এই ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ দুটি যুদ্ধ স্বীকার করে: ‘ভাইয়ে-ভাইয়ে’ পাকিস্তানি গৃহযুদ্ধ আর ভারত-পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক যুদ্ধ।

Full articles below

ফটোশপে ম্যানিপুলেশন ক্যামনে গরীবের রাজনীতি?

by Mirza Taslima on Friday, March 8, 2013

নীচে প্রথম ছবিটি বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে সকলেই দেখেছেন। দ্বিতীয় ছবিটি পত্রিকায় প্রকাশিত এবং আমার পিএইচডি গবেষণায় এই ছবিটি আমি বিশ্লেষণ করছি। বলা প্রাসঙ্গিক আমার গবেষণার বিষয় বাংলাদেশে আইভিএফ (যা ‘টেস্টি-টিউব’ পদ্ধতি নামে বেশী পরিচিত) প্রসিডিউরের আগমন ও তৎপরবর্তী অবস্থা নিয়ে।যখন দ্বিতীয় ছবিটি নিয়ে আমি বিশ্লেষণে গলদঘর্ম তখনই সাঈদীর উপরের ছবিটি ফেইস বুকের নিউজ ফিডের মাধ্যমে দেখতে পাই।প্রথম ছবিটি ফেইসবুকে প্রকাশিত হয় যে রাতে সেই একই সময়ে বাংলাদেশের নানান জেলায় মসজিদে মসজিদে ঘোষণা দেওয়া হয় যে ৭১’ এ মানবতা বিরোধী অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় ফাঁসীর দন্ডে দন্ডিত আসামী সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে। যা এই মানে তৈরি করার অভিপ্রায় থেকে করা হয় যে সাঈদী নিস্পাপ ও আল্লাহ্ র কাছের, তাই তাকে চাঁদে দেখা গেছে। সুতরাং এর সাথে এই মেসেজ দেওয়া হয় যে আদালতের রায়ের প্রতিরোধ/প্রতিবাদ করতে লোকজন যেন রাস্তায় নেমে আসে। এই ঘটনার আগে আমরা দেশের নানা জায়গায় সহিংসতা, ধ্বংসযজ্ঞ ও অনেক মানুষের মৃত্যু প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু এই প্রচারের পরদিন দেশের কোন কোন অন্ঞলে নাশকতা ও  মৃত্যুর মিছিল বেড়ে যায়। ছবি নিয়ে জামাত মিথ্যার ও ম্যানুপুলেশনের রাজনীতি করছে বলে যখন অনেকে অভিযোগ করছেন, তখনই আবার আরো একদল একে শ্রেণির লড়াই হিসাবে দেখতে চাইছেন।

এবার আসি নীচের দ্বিতীয় ছবিটির প্রসঙ্গে, লক্ষ্য করুন, একটি টেস্ট-টিউবের ভিতরে একটি হাসিখুশি নবজাতককে দেখা যাচ্ছে।এই ছবিটি আঁকা হয়েছে কিংবা ডিজিট্যালী ম্যন্যুপুলেট করা হয়েছে। তবে এর অর্থ তৈরি করার বিষয়টি সাঈদীর ছবি চাঁদে বসানো মতই।।আইভিএফ পদ্ধতিতে চিকিৎসকেরা পেট্রি ডিসে শুক্রানু আর ডিম্বানুর মিলন ঘটান, যেখান থেকে এম্ব্রায়ো তৈরি হয় এবং এই এম্ব্রায়ো কোন নারীর জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হয়, গর্ভবতী হওয়া সফল হলে এই এম্ব্রায়ো পরিপূর্ণ শিশুতে পরিণত হয় নারীর জরায়ুতে এবং সবশেষে নবজাতকের জন্ম হয়। সুতরাং, কোন শিশু টেস্ট টিউবে পরিপূর্ণ অবয়ব পায় না। সঙ্গত কারণে প্রশ্ন করতে হয় ছবির টেস্ট-টিউবে শিশু এল কেমন করে? যখন এই চিত্রায়ন সত্য নয়, তখন প্রশ্ন উঠে এরকম ছবি পত্র্রিকায় দেওয়া হলো কেন?

সংবাদপত্রের এই নির্দিষ্ট (উল্লেখিত ছবিটি সহ) ফিচারটি টেস্ট-টিউব পদ্ধতির সার্থকতাকে প্রাধান্য দিয়ে লেখা। ধারণা করি এই টেস্ট টিউবের ভিতরে এম্ব্রায়ো না দেখিয়ে একটি শিশু দেখানো হয়েছে সন্তান প্রত্যাশি নারী পুরুষকে আইভিএফ পদ্ধতি গ্রহণে প্রলুব্ধ করতে।অপরিচিত আনুবীক্ষণিক এম্ব্রায়ো(যা আসলে এই প্রক্রিয়ায় টেস্ট টিউবে সৃষ্টি হতে পারে।)সন্তান প্রত্যাশী নারী পুরুষের কাছে ততটা আবেদন রাখতে পারে না যতটা পারে একটি শিশু। সেকারণেই হয়তো শিশুটির ছবি টেস্ট টিউবে বসানো হয়েছে। এতে নারী পুরুষেরা আইভিএফ পদ্ধতিতে বিশ্বাস স্থাপন করবে, ও পদ্ধতিটি গ্রহণ করবে, ফলে আইভিএফ ক্লিনিকগুলো ক্রমাগত ক্লায়েন্ট পাবে ও এতে তাদের মুনাফা তথা তাদের ব্যবসা নিশ্চিত হবে। অথচ আইভিএফ পদ্ধতি অত্যন্ত ব্যায়বহুল ও সার্থকতার হার মাত্র ২০ ভাগ। অর্থাৎ এই প্রসিডিউর গ্রহণকারীদের ৮০ ভাগই লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করেও কোন সন্তান লাভ করেন না। আমরা আমাদের সমাজ ও সাংবাদিকতার নৈতিকতার বিচারে কি এই ক্লিনিকগুলোর মুনাফার সমর্থনে করা ফটোগ্রাফের ম্যানিপুলেশনকে যথাযথ বলতে পারি? এতে কার লাভ ও কার ক্ষতি? ।এখানে বিজ্ঞাপনের কনস্ট্রাকশন প্রাসঙ্গিক।

মডেল সিন্ডি ক্র্যাফোর্ড বিজ্ঞাপনে তাঁর নিজের ছবি দেখে বলেন “আহা আমি যদি সিন্ডি ক্র্যাফোর্ডের মত হতাম”। কারণ তাঁর বিজ্ঞাপনের সৌন্দর্য ফটোশপের মাধ্যমে বানানো সৌন্দর্য।তখন বিজ্ঞাপনের নৈতিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে হয়। এমনি এমনি সিন্ডি এটি বলেননি, পাশ্চাত্যের নারী যেন বিজ্ঞাপনের নারী শরীর থেকে প্রলুব্ধ হয়ে ডায়েট করে করে এনোরেক্সিক না হয়ে উঠেন, সেই সাবধানতা উচ্চারণ করতে এই সত্য প্রকাশ করেছেন তিনি।পুঁজিবাদের আধিপত্য বিজ্ঞাপন প্রসঙ্গে সকল আপত্তিকে খেয়ে দিব্যি টিকে থাকছে। তাবলে বিজ্ঞাপন সমর্থন যোগ্য হয়নি, সেকারণে এর রাজনীতি উন্মোচন জরুরী ভিত্তিতে করা হচ্ছে।

একই বিচারে সাঈদীর চাঁদে মুখ বসানো ও মসজিদে ঘোষণা দিয়ে জনগণকে সাঈদীর জন্য পথে নামিয়ে দেওয়াটাকে কি সমর্থন করা যায়? সামাজিক গবেষক ও ইতিহাসবিদগণ গুজব/রিউমার নিয়ে নানা কাজ করেছেন। গুজব অনেকমসয় প্রান্তিক মানুষজন অধিপতিকে মোকাবেলার জন্য ব্যবহার করে। যেমন অঙ্গ প্রতিস্থাপন প্রসঙ্গে বাচ্চা চুরি হওয়া ও সেই বাচ্চার কিডনি তুলে নেওয়ার গুজব ল্যাটিন আমেরিকায় দেখা যায়, এ গুজব আমাদের দেশেও আছে । এই গুজব দিয়ে প্রবলকে প্রান্তিক নিরন্তন অস্বস্তির মধ্যে রাখে।মনে রাখা প্রয়োজন এই গুজব প্রান্তিক মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ হলে একে তার লড়াইয়ের কৌশল হিসাবে বিবেচনা করা যায়।ভাবা প্রয়োজন সাঈদী প্রসঙ্গে গুজব কি স্বতঃস্ফূর্ত প্রান্তিক/সাবঅল্টার্ন মানুষজনের? নাকি এটি শহুরে/গ্রামের মধ্যবিত্তেরই তৈরি করা। আশা করি কুতর্ক করতে করতে কেউ বলবেন না যে এখন বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষজন কম্পিউটারের ফটোশপেও পারদর্শী!অন্যদিকে এই গুজব প্রান্তিক জনগণের কোন প্রান্তিকতাকে মোকাবেলার জন্য? স্পষ্টতঃই একটা রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা, যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকাতে এই গুজব ছড়ানো হয়েছে।কথা হলো এই দলটি কি আমাদের দেশের প্রান্তিক মানুষের রাজনীতি করে?সারের দাবীতে আন্দোলনরত কৃষকের পাশে কি কখনও তাদের দাঁড়াতে দেখেছি আমরা? নাকি তারা পুড়ে যাওয়া গার্মেন্টস শ্রমিকের পরিবারের লড়াইয়ে সামিল হয়েছে?কানশাট ও ফুলবাড়ির কথা না হয় নাই বল্লাম।৪২ বছর ধরে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেও দাপুটে রাজনীতিক সাঈদী কি বাংলাদেশের সমাজে প্রান্তিক? সাঈদী ধর্মের ব্যাখ্যা দিত, আবেগে জনগণকে ভাসিয়ে দিতে পারত হয়তো, কিন্তু গরীব মানুষের কোন মৌলিক বন্ঞনা মোচনে সাঈদী বা তার দল তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে?

মানতে হয়, বাংলাদেশে যারা শ্রেণির রাজনীতি করেন বলে দাবী করেন, তারা গরীব বাঙালী মুসলমানকে যথাযথ মূল্য দেন নাই, প্রান্তিকের চৈতন্যকে ‘নিজেদের উচ্চতর’ অবস্থান থেকে নানা সময়ে অবহেলা করেছেন। আরও মনে করি, কোরাআনের বাণী প্রচার ও তার তাফসীর ধার্মিক পন্ডিত ব্যাক্তিবর্গ করতেই পারেন। কিন্তু সাঈদী তার ওয়াজে নারী বিদ্বেষী যৌনবাদী ব্যাখ্যা দিত, তা কিভাবে সমর্থন করি? তার ব্যখ্যার নির্দিষ্ট রাজনীতি তো স্পষ্ট। কি করে না বিবেচনা করি যে সে তার ওয়াজে মুসলমানের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরতে স্পষ্টতঃ অন্যান্য ধর্মের মানুষকে খাটো করত, স্পষ্ট সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়াত (কেউ চাইলে ইউটিউবে সার্চ করে শুনতে পারেন তার বক্তব্য), সর্বোপরি তাকে সমর্থন করা যায় না কারণ সে ৭১ এর মানবতাবিরোধী অপরাধে অপরাধী।  ফলে তাকে বাঁচানোর রাজনীতিও সমর্থন করা যায় না।

ছবি ১: ফেইস বুক থেকে পাওয়া।

ছবি ২: যুগান্তর (০৪.০৮.২০০৬)পুঁজির দুনিয়ায় শাহবাগ নামক ফেনোমেননের অর্থ-অর্নথ কি-‘ভাবে’ ‘বিচারিব’ ?
Aaditiya Das on Facebookপুঁজির মধ্যে হারিয়ে ফেলা ‘মানুষের’ যুগে আমাদের বসবাস। ‘মানুষ’ পুঁজির মধ্যে হারিয়ে যাওয়ার আগে কেমন ছিল ? এই প্রশ্ন ‘পুঁজি’র গোলামে পরিনত হওয়া ‘মানুষ‘ মাত্রাই হারিয়ে ফেলে । পুঁজির বাইরে মানুষের অতীতি-বর্তমান-ভবিষৎ কেমন ছিল-আছে-হবে পুঁজির যোগে সমাজে এই প্রশ্ন গায়েব হওয়া মানে ‘পুঁজি’ আর ‘মানুষ’ একাকার। পুঁজি তার স্বভাবগুণে তার বিকাশে বাধা যে কোন ‘অপর’কে শত্রু বানায় এবং সহগামীরে বানায় পণ্য । পুঁজির দুনিয়ায় শাহবাগ নামক ফেনোমেননের অর্থ-অর্নথ কি-‘ভাবে’ ‘বিচারিব’ ? এই লইয়া দু’দশ আলাপ পড়তে চাই । শাহবাগে ফেব্রুয়ারীর প্রথম সপ্তাহে জমা হয় ঢাকার মধ্যবিত্ত তরুণ-তরুণীর এক অংশ । তারা না বললেও সমাজে চালু;এই জমায়েতের রাজনীতি আছে । তাদের রাজনীতি নিয়ে সমাজের নানান অংশে তর্ক চলছে । এই তর্ক রাজনৈতিক এটা বলার অপেক্ষা রাখে না । তরুণ-তরুণীদের বাকি যে অংশ এখানে আসে নাই বা বিরোধীতা করতাছে বা করতাছে না; তারাও রাজনীতি করতাছে । ত মোটা দাগে দুই শিবিরে ভাগ হওয়া তরুণ-তরুণী আলাদা কৈই ? ভাগ হয়ে পড়া এই তর্কের রাজনৈতিক ‘তাৎপর্য’ বা কি ? যে কোন রাজনৈতিক বিষয়ের মূল্যায়ন বা বিচার অরাজনৈতিক হতে পারে না; তারও রাজনীতি আছে । আমাদের সারনীতি ‘পুঁজি’র জগৎই মানুষের নিয়তি এইটারে প্রশ্নবিদ্য করা’ ।
পুঁজির বাসনায় আটকা পড়া মানুষ অথবা সমাজ অথবা শাহবাগের তরুণ-তরুণী কি চাইয়া শ্লোগান দিতাছে ? কেউ ফাঁসি চায় কেউবা বিচার চায়। কার কাছে কে চায় ? পুঁজির স্বসস্শ্র এজেন্ট বা পাহাড়াদার যে রাষ্ট্র তার কাছে বিচার চায় এক অংশের তরুণ । তারা মনে করে পুঁজির স্বসস্শ্র পাহারাদার এই রাষ্ট্র এতে নিজের জন্মের বৈধতা পাবে । র্বতমান রাষ্ট্র তাহলে কি অবৈধ ? তা রক্ত দিয়া কামাই করা বটে কিন্তু বৈধতার মামলা শেষ হয় নাই বইলাই ফাঁসির কথা অনেকে কয় । পুঁজির যোগে ‘পুঁজি’ আপন স্বাথে রাষ্ট্র পাল্টায় । তার সাথে আইন-আদালত-রাজনীতিরে খাপ খাওয়ায় লয় । কেউ বাধা দিলে তারে উচ্ছেদ-ফাঁসি-রাষ্ট্র দখল যা যা লাগে তা তা করে । শ্রমিক-মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত এমন সব ভাগ দাড়ায় পুঁজির মালিকানার স্তর ভেদে । রুচির প্রশ্নেও ভেদ তৈয়ার হয় । আপনি পুঁজির রুচি আয়ত্ত্ব করতে চান না বা করার ক্ষমতা নাই । সুতরাং আপনি অনাধুনিক বা পশ্চাৎপদ ‍পুঁজির পক্ষের লোক জনের কাছে । কোন কোন ক্ষেত্রে কু-সংস্কারাচন্নও বলবে আপনারে । পুঁজির ডিকশনারিতে আপনি প্রাচীন-পুরাতন মাল মাত্র । আপনারে দখল বা ধংস ছাড়া তার নিরাপত্তা নাই । পুঁজির রাষ্ট্রে আপনার উপর তার দখল-ধংস-নিরাপত্তার জন্য র্আমি-পুলিশ-আর আছে তার সিপাহশালার আধুনিক বা ভোগি-পণ্য হয়ে উঠা মানুষ । এই আধুনিক বা ভোগি-পণ্য হয়ে উঠা মানুষই রাষ্ট্ররে ‘তার মত‘ করে বানাতে চায়। এটাই তার ‘স্বাধীন ইচ্ছা’ বলে প্রচারিত । আধুনিক রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ইহারেই কয় ।
আধুনিক রাষ্ট্রে স্বাধীন ইচ্ছার নামান্তর ‘পণ্য’ হয়ে উঠা। পণ্য রূপি ‘মানুষ’ আর ‘রাষ্ট্র’ এক বাসনায় মিলিত হওয়ার নামই নিরাপদ বা স্বাধীন রাষ্ট্র । এরশাদ-হাসিনা-খালেদা-আপা এবং অবশ্যই জামাত গং পুঁজির আদলে রাষ্ট্র বা সমাজ গড়তে চায় । পুঁজির আদলে মানুষ গড়াই এরশাদ-হাসিনা-খালেদা-আপা এবং অবশ্যই জামাত গংদের কাছে উন্নয়ন বা ইসলাম নামের হাক-ডাক । যে মানুষ পুঁজির আদল থেকে বের হতে চায়, সে যেমন শত্রু । তেমনই শত্রু যারা এখনো সামান্যেও কিংবা পুরোপুরি ঢুকে নাই পুঁজির পুটলিতে । শাহবাগে জমায়েত হওয়া আদমিরা কোন পুটলিতে গিট্টু মারা ? পুঁজির পুটলিতে পয়দা হওয়া পণ্যবাদী মাল বা মানুষই শাহাবাগের ঘটনা বা রটনা। এদেরই চালু নাম সুশীল-প্রগতিশীল-আওয়ামী লীগ । আর যে মালেরা আসে নাই ? তাহাদের দুই ভাগ । এক ভাগ শাহাবাগের দোসর পণ্যবাদী মাল; যারা শাহবাগ ছাড় দিলে একলগে খাইব-নাচব-ঘুমাই-চুদাচুদিতেও আপত্তি থাকার কথা নাই। এদের চালু নাম বিএনপি-জামাত। এরা তলে তলে এবং উপরে উপরে টাকা বানানোর ব্যাংক-বীমার পার্টনার । অন্য ভাগা না সুশীল-না প্রগতিশীল-না আওয়ামী লীগ-না বিএনপি । এরা পুজিঁর জগতে ঢুকতে না পারার অক্ষমতা চাহেতু অনাধুনিক-কুসংস্কারন্ন-নিম্নবিত্ত কিংবা বৃত্তহীন কৃষক-শ্রমিক আর আর অনাধুনিক মুল্যবোধ ধর্মধারী গরিব মোল্লা-মৌলবি । ট্যাগ নাম মৌলবাদী। ত শাহবাগের আধুনিকরা জিকির তুলছে জামাতি লিডার গ ফাঁসি চাই । নাইলে ১৯৭১ সালে অনাধুনিক কৃষকদের সম্মুখ যুদ্ধে জয় করা জয় বাংলা বৈধ হইব না ।
উল্লেখ্য, তখনকার কৃষকচৈতন্যের জয়করা বাংলাদেশ কিন্তু আধুনিকরাওলারা দখলে নিচে তা-গ আধুনিক ‘ইচ্ছা রাষ্ট্র’ বানানোর মতলবে । আল্লাহ-হরি-গড সাক্ষি তারা কৃষক চৈতন্যরে খারিজ করে যে পণ্যবাদি রাষ্ট্র কায়েম করতে চাইল; তা এখনো অসম্পূণ থাইকা গেল । কারণ এই পণ্যবাদি রাষ্ট্ররে গত ৪২ বছর ধরে যে যে দখলে রাখছে সে সে ‘ব্যক্তি’র বাইরে ‘নাগরিক’ গ নিয়া ভাবে নাই; এখনো ভাবে না । বরং যারাই ব্যক্তির বিরোদ্ধে নাগরিগ গ রাষ্ট্র কায়েমের কথা কইছে; তাদের নির্মূলের জন্য ক্রসফায়ার-গুম-বিনাশের সমস্ত পন্থাই প্রয়োগ করা হইছে । রাষ্ট্র যখন শুধু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অথবা বিশেষ শ্রেণীর গোলামি করে; সেই রাষ্ট্র ন্যায় বা ইনসাফের উপর দাড়িয়ে সকল নাগরিকের হয়ে উঠে না । নিবাচনী ভেলকীবাজিতে যে যখন ক্ষমতায় থাকে সে তখন তার স্বাথই হাসিল করতে চায় । বর্তমান পরিস্থিতি পণ্যবাদী আধুনিক বিশেষ ব্যক্তি বা শ্রেণীর নিজেদের মধ্যে ক্ষমতায় টিকে থাকার মামলা ।তারা নিজেদের মধ্যে লড়তে যেয়ে অপরাপর শ্রেণীকে ব্যবহার করছে মাত্র । আওয়ামী আধুনিকরা ব্যবহার করছে শাহবাগে জড়ো হওয়া জমায়েতকে । আর জামাতিরা এর বাইরে পড়ে থাকা ধর্মদাড়ি আধুনিক-অনাধুনিক তরুণ এবং কৃষককে ব্যবহার করছে ।
অনাধুনিক-অজামাতি কৃষক-চৈতন্য ব্যক্তির গোলামে পরিণত হওয়া রাষ্ট্রের অন্যায্যতাকে; সাঈদীর প্রতি রাষ্ট্রের রায়কে বে-ইনসাফ আকারে পাঠকরে মাটি থেকে মুখ ফিরাইয়া চাঁদে গিয়া ইনসাফ খোঁজে; সেখানে যে ফাঁদ কে দেখাবে তারে ? নাগরিক স্বাথবিরোধী এই রাষ্টের পুলিশ-বিচারব্যবস্থা-আধুনিক পণ্যবাদি-ব্যক্তি সবই এই অনাধুনিক-কৃষক-মৌলবির জগতে ‘অপর ‘ । তার শত্রু এই ‘অপর’ কে মোকাবেলা করে যে নতুন ক্ষমতার দিশা তৈয়ার করছে; তার প্রতি সে জোকে পড়ছে । শহরে বসে বসে আধুনিক যুক্তিবিদ্যার বাহাদুরি দিয়ে;মিডিয়া-পুলিশ-মধ্যবিত্ত পরিসরকে বাংলাদেশ ভেবে, যারা এই সব অনাধুনিক মানুষগুলোকে জঙ্গি জামাতি ভেবে গালাগালি করছেন । সন্ত্রাসি বলে অন্যায্য রাষ্ট্রকে লেলিয়ে দিচ্ছেন । তত্ত্ব ফেরি করছেন । তারা গণবিরোধী জামাতের সাপোটার বাড়ানোই শুধু নয়, সাধারন মানুষকে খুন করার বৈধতাও তৈয়ার করছেন;অন্যায্য রাষ্ট্রের তরফে । জামাতি-আওয়ামী-বিএনপি যে শ্রেনী স্বাথের রাজনীতি করে শাহবাগে জমা হওয়া তরুণরা সে শ্রেনীর বাসনায় পয়দা হওয়া এবং ঘোরাফেরা করা ‘মানুষ‘ । এই শ্রেণীকে আমরা অথনৈতিক এবং রাজনৈতিক চেতনায় ‘মধ্যবিত্ত’ নামে দাগ দেই । এই ‘মধ্যবিত্ত চৈতন্য‘কে যারা পরিচালিত করছে তাদের অথনৈতিক স্বাথ উচ্চবিত্ত চৈতন্যের সাথে যুক্ত । এই উচ্চবিত্ত চৈতন্যের অপর নাম ‘পুঁজি‘ । ‘
পুঁজি’র জগতই মানুষের জগত তা মানবে কেন ‘মানুষ’ ? পণের জগতে আটকে পড়া বিবেক বিকিয়ে বেচে থাক ‘মানুষ’, তাই মাকর্স-নবী মুহাম্মদ কিংবা অন্য যেকোন নামে; মানুষের জগৎ-বিবেকের জগৎ খোঁজবে। খোঁজবেই । ফলে লড়াই চলবে পুজিঁর গোলামীর বিরোদ্ধে । বর্তমান সংকট ইতিহাসের এই দিকে যদি আমাদের চৈতন্য ফেরায়; তাহলে তথাকথিত সহিংসতাকে পেটি নৈতিকতা থেকে না দেখে;অন্যায্য রাষ্ট্রিয় সন্ত্রাসের বিরোদ্ধে পাল্টা সন্ত্রাস আকারেও দেখতে পারি । ন্যায় প্রতিষ্ঠার আকাংঙ্খা যেখানে চাপা পড়ে আছে হয়ত । সব কিছুকে অচল-অনড়-বিশুদ্ধ-পূর্ব ধারণা দিয়ে বিচার করার মৌলবাদী পন্থাই কি প্রগতিশীলতা ? এই মৌলবাদী প্রগতিশীল পণ্যবাদী সন্ত্রাস অন্যায্য রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখার প্রতিক্রিয়াশীল চেষ্টা । জয় হউক পুঁজির পাহারাদার অন্যায্য রাষ্ট্রের বিরোদ্ধে সন্ত্রাস চালিয়ে যাওয়া বিবেকি মানুষের।


একাত্তরের অ্যান্টিথিসিস বনাম মুক্তিযুদ্ধের হিস্টরিক ব্লকের প্রথম বসন্ত
by Faruk Wasif on Saturday, March 9, 2013

”এ রকম কোনো এক ‘এক্স’-এর উদয় জামায়াতকে এক ধাক্কায় অনেক ওপরে নিয়ে যেতে পারে। আর সেই উঁচু মিনারে দণ্ডায়মান হয়ে সে যা করবে, তা বিশুদ্ধ ‘দেশপ্রেম’ না হোক, ‘মুক্তিযুদ্ধের সমান না হোক, হবে গুরুত্বে তারই প্রতিপক্ষ। আর জনগণ এমনই বিহ্বল থাকবে যে, তৈরি হওয়ার আগেই একটা ওলট-পালট ঘটে যাবে। এবং সেই ‘উল্টানো একাত্তরে যুদ্ধাপরাধীদের আর যুদ্ধাপরাধী মনে হবে না, মনে হবে ত্রাতা’ একাত্তরের এ্যান্টিথিসিস এবং রাজনীতির অদৃশ্য ‘এক্স’ ফ্যাক্টর

১.

জামায়াতে ইসলামীর বয়সও প্রায় একাত্তর। সরল পরিচয়ে দলটির রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধের অ্যান্টিথিসিস রচন বা বাংলাদেশের আইডিয়া খণ্ডন। এ ব্যাপারে তারা কখনো দম ফেলে নাই। এদের রাজনীতির আখেরি লক্ষ্য একাত্তরের খণ্ডনের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের অ্যান্টিথিসিস প্রতিষ্ঠা। এই মিশন তো অতীতে গিয়ে সারা যাবে না। কিন্তু অতীত বিকৃত করা যায়, ইতিহাস বদলে ফেলাও অসম্ভব না। নবাব সিরাজ ইংরেজের প্রথম দেড়শ বছর খলনায়কই ছিলেন।

একাত্তরের থিসিসটা আদতে কী ছিল? পূব-বাংলার মজলুম হিন্দু-মুসলমান পাকিস্তানবাদ বাতিল করে সর্ববাঙালির নেতা হয়ে উঠেছিল। পাকিস্তানি দ্বিজাতিতত্ত্ব আর তার সহোদর ভারতীয় একজাতিতত্ত্ব খণ্ডন হয়েছিল যে অস্ত্রে, তার নাম বাঙালি জাতীয়তাবাদ। পাঞ্জাবি শাসকদের জাতিগত শোষণের জিঞ্জির ছিঁড়ে কেবল জাতীয় স্বাধীনতাই অর্জিত হয় নাই, ধর্ম, জাতি আর ভাষা পরিচয়ও আধিপত্যমুক্ত হয়। অর্থাত_তত্ত্বগত অর্থে_মুসলমানের বাঙালি হওয়ার নিষেধাজ্ঞা যেমন থাকল না, তেমনি অমুসলমান বাঙালি আর বাঙালি-ভিন্ন পরিচয়গুচ্ছেরও আত্মবিকাশের বাধা রইল না। বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় নতুন রাষ্ট্রে সর্বজনজাতির ‌বাংলাদেশি ‘ন্যাশন’ গড়ে উঠবারো কথা ছিল। কথা ছিল সংখ্যাগুরু আর সংখ্যালঘু পরিচয়ের বিপদ এড়িয়ে জনগণের রাজনৈতিক পরিচয়কে শানিত করার।

অন্যদিকে জামাত বুঝাতে চায়, পরের গোলামি থেকে মুক্তি আসল মুক্তি না। এটা বেজাত-বেধর্ম-বেইমানির ফাঁদ। মুক্তি হলো মওদুদীবাদে ভর করে ভারতবিরোধী সংগ্রাম; অর্থাত ভুল প্রমাণ হওয়া দ্বিজাতিতত্ত্বের পুনপ্রতিষ্ঠা, যা কার্যত সামাজিক সাম্প্রদায়িকতার রাষ্ট্রীয় বিকাশ। তাদের চোখে একাত্তরে ভারত জিতেছে বাঙালিদের গাদ্দারির কারণে। বাংলাদেশের অভ্যুদয় আমলে আনতে তারা নারাজ।

একাত্তর তাদের কাছে সাতচল্লিশের দাঙ্গার সম্প্রসারণ; গৃহযুদ্ধের বেশি কিছু না। তাদের মনের ঘোর অন্ধকার, যার নাম হোমল্যান্ড পাকিস্তান; বাংলাদেশে তারা তো গৃহহারাই থাকবে। এই হোমল্যান্ড মানে ভূমি না_ দেশের আদর্শ, রাষ্ট্রের আইডিয়া; যা পরাস্ত হয়েছে একাত্তরে। আপনি যেখানে পথ হারান, ফিরে ফিরে সেখানেই খুঁজতে যান। তাই তারা বারবার একাত্তরে ফেরে হারানো দেশ (পাকবাংলা) খুঁজতে, হার মানা ‘গৃহযুদ্ধ’ পুণরায় চালু করতে। পরাজয়কে তারা বিজয়ের কিনারে ঠেকাতে চায়। একাত্তরের দায় অস্বীকারের করলে ইতিহাস, রাষ্ট্র ও সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেই হবে তাদের। এই একরোখা রাজনৈতিক প্রকল্পেরই অপর নাম ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ। শাহবাগের মৃত্যু পরওয়ানা এই ফ্যাসিবাদেরই বিরুদ্ধে, নিছক ব্যক্তির জান কবচের দাবি এটা না।

এই শাহবাগকে স্থানের পরিসরে আর নেতৃত্বের চরিত্রে ধরতে চাওয়া চিন্তার অদূরদর্শিতা। দলীয় জমায়েতের বাইরের লক্ষ-কোটি মনে তা যে আলোড়ন তুলেছে, তার নেতা কোনো ‌’সরকার’ মহাশয় নন। সরকারি ইশারাতেও তা চলছে না। তা চলছে অসমাপ্ত মুক্তিসংগ্রামের গতিসূত্রে, শাসকশ্রেণীর দলগুলোর ভিত নাড়িয়ে।

২.

একাত্তরের অ্যান্টিথিসিসকে জয় পেতে হলে জাতীয় ইতিহাসের জায়গায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে জামাতি ইতিহাস। জনমনে প্রোথিত চেতনাধারাকে খারিজ করতে হবে দলীয় বাগধারা দিয়ে। সেই বাগধারায় ২০১৩র জামাতি গণ্ডগোল হবে ‌’গণহত্যা’ আর একাত্তরের গণহত্যা হবে ‌’গণ্ডগোল’। মুক্তিযুদ্ধ হবে ‌’গৃহযুদ্ধ’, স্বাধীনতা হবে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’। মুক্তিযোদ্ধারা হবেন ‘গাদ্দার’ আর রাজাকার হবে স্বাধীনতার সৈনিক। অসাম্প্রদায়িকতা বর্ণিত হবে হিন্দুয়ানি বলে। হিন্দুদের বাংলাদেশি বাঙালি না বলে বলতে হবে ‘ভারতের দালাল’। বাংলাদেশ ও এর জনগণের সার্বভৌমত্বের আকাংখা নাজায়েজ হবে। সহিংসতা দমনে রাষ্ট্রের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের বিরোধিতা করতে ‘গণহত্যা’ কথাটা কেন আনতে হলো তাদের, এই সূত্রে তা পরিষ্কার হবে। এই ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ দুটি যুদ্ধ স্বীকার করে: ‘ভাইয়ে-ভাইয়ে’ পাকিস্তানি গৃহযুদ্ধ আর ভারত-পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক যুদ্ধ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এদের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ লোপাট থাকে। ইসলামের ছাপ্পা ছাড়া এদের আর কিছু দেখাবার নাই, যে ইসলামের এজেন্সি আবার স্বঘোষিত। এরা বয়ান করে ইসলাম বনাম বাঙালি জাতীয়তাবাদের কাল্পনিক যুদ্ধকাহিনী। সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন-ব্রিটিশ-সৌদ-কাতার আর তাদের আল জাজিরা, সিএনএন বিবিসির ‘বাংলাদেশ দর্শন’ও এই পদের। অবাক হব কী, ভারতীয় সেনাপতি মানেকশও মনে করেন, তাঁরাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার জনক। তিন তরফই বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনকে গৃহযুদ্ধ আর আন্তর্জাতিক যুদ্ধের পার্শ্বফল ভেবে আহ্লাদিত হন। জনকদের সন্তানটি এখানে দেশপ্রেমের ফসল নয়, দ্বিজাতিতত্ত্ব বনাম ভারতীয় একজাতিতত্ত্বের পারস্পরিক বলাতকারের যুদ্ধশিশু। এই যুক্তিতে কার্যকারণ সম্পর্ক উল্টে ফল যেন গাছকেই ভক্ষণ করে। ‘একজন কেন লক্ষ সৈনিকেরও কাজ নয়, কোনো দেশ স্বাধীন করা। সেটা তাদের ক্ষমতার বাইরের ব্যাপার। পরাধীন দেশের বেলায় তা আরো সত্য। সমগ্র জনগণের গভীর সাংষ্কৃতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক প্রস্তুতি ও সংকল্প না থাকলে জাতীয় যুদ্ধে বিজয়ী হওয়া যায় না। এই জিনিস সেনা কমান্ডে গঠিত হয় না।’ তাহলে স্যাম মানেকশ-ই বাংলাদেশের স্রষ্টা? শেখ মুজিবের জবানে স্বাধীনতা ঘোষিত হয়েছিল বাঙালির জেদের কারণেই। এটাই আদি কারণ, বাকিসব পার্শ্বফল। কার্যকারণ সম্পর্কের গোড়ায় ইতিহাস প্রতিষ্ঠাকারী ঘটনা হিসেবে বসে আছে ৫২, ৬৯, ৭০ এর গণজাগরণ। যাহোক, একাত্তরের সহযোগীদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ হলেও ভারতপন্থী সুকপাখিদের কৃতজ্ঞতার উদরাময়ে কিংবা পাকপন্থিদের বদখোয়াবে জাতীয় সংগ্রামের গর্ব হড়হড় করে ভাসিয়ে দিতে আমরা নারাজ।

বাংলাদেশ বেদনার সন্তান। সেই বেদনাকে দু:সহ করায় সাধ্যের শেষ পর্যন্ত গেছে জামায়াতে ইসলামী। হারের পরও তারা শাস্তি পায়নি, বরং পেয়েছে অসমাপ্ত মুক্তিসংগ্রামকে গৃহযুদ্ধের ময়দানে ফের ডুবানোর দেশি-বিদেশি মদদ। মুক্তিযুদ্ধ গৃহযুদ্ধ হলে গণহত্যা হয় পাল্টাপাল্টি সন্ত্রাস। শাস্তি দেওয়ার আন্দোলন হয় ‌ফ্যাসিবাদ, আর ঘাতকপন্থী ফ্যাসিবাদকে বলা হয় মজলুমের সংগ্রাম। আজকের মুক্তিযোদ্ধারা হয় হঠকারী আর মর্দে মুমিন মাহমুদুর রহমানের মানস সন্তানেরা হয় গণতন্ত্র ও ইসলামের সৈনিক। সন্ত্রাসী আর মুক্তিযোদ্ধার নিরিখও ফরহাদ মজহারের ভেলকিবাজিতে একাকার হয়ে যায়। তখনই গোলাম আযম হন সম্মানিত নাগরিক আর জাহানারা ইমাম হন ‘দেশদ্রোহী’। শাহবাগে হাজির হওয়া আজকের রুমীরা সুতরাং গৃহযুদ্ধের ‘খলনায়ক’। একাত্তরের অ্যান্টিথিসিস বা খণ্ডন তাই বাংলাদেশপন্থী রাজনীতি, ইতিহাস ও আদর্শেরই খণ্ডন। জামাতের বোবা রাজনীতি ভাষা পাচ্ছিল না, ফরহাদ মজহার আর মাহমুদুর রহমান তাদের সেই ভাষা দিলেন। বাকশক্তি প্রাপ্ত হয়েই আমার দেশের বরাতে তারা জিগীর তুললো, ‌’ফ্যাসিবাদ ফ্যাসিবাদ’। কিন্তু মাঝরাতে মোরগ ডাকলেই ভোর আসে না। (মাহমুদুর রহমান আর ফরহাদ মজহার আওয়াজে যত বড় বাখোয়াজ হোন না কেন, ইতিহাস তাদের ডন কুইজো আর তার স্যাঙাত সাংকো পাঞ্জা বলেই চিনবে। ফরহাদকে যারা ছফার ওয়ারিশান ভাবেন, তাদের বলি, ছফা যে চিন্তার আকার, সলিমুল্লাহ খান তার এক প্রকার, ফরহাদ মজহার হলেন বিকার। প্রকারে বিকাশ, বিকারে বিলয়।)

নক্ষত্র চুপসে কৃষ্ণগহ্বর হয়। জার্মানিতে রোজা লুক্সেমবার্গদের বিপ্লবী উত্থান প্রতিহত করেই ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছিল। ফ্যাসিবাদকে সর্বদাই পাল্টা অভ্যুত্থান মোকবেলা করতে হয়, অথবা সর্বজনের উত্থানকে সর্বদাই ফ্যাসিবাদের মোকাবেলায় নামতে হয়। শাহবাগকে মোকাবেলার নামেই ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ গর্ত থেকে মুখ বের করেছে, একে মোকাবেলার দায়িত্ব অবশ্যই শাহবাগের। কিন্তু এর বাড়বৃদ্ধির জন্য দায়ি একাত্তরের অমীমাংসিত ইতিহাস_ লীগ ও বিএনপি যার কুশ ও লব। শুরুর এক মাস পর গণজাগরণ দলীয় খুঁটিতে সীমিত, ধর্মীয় ফ্যাসিবাদও যতটা গর্জে ততটা বর্ষানোর ক্ষমতারহিত। ফ্যাসিবাদ কায়েমের জন্য যে সামাজিক ভিত্তি, ইতিহাসের দখল ও অর্থনৈতিক শক্তি লাগে, জামায়াত সেসবের বিজ্ঞাপন মাত্র, কিনতে গেলে ঢনঢনা। তাদের আছে নাশকতার যোগ্য সংগঠন। এজন্যই সিরিয়ার জঙ্গিদের মতো মার্কিনিরা তাদের পেছনে বাজি ধরেছে। উদ্দেশ্য গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে ভূরাজনৈতিক ফায়দা আদায়। নিজের বলে কিছু করতে পারে না বলেই চিরকাল বাঘের ফেউ হয়ে থাকার নিয়তি জামাতের। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের হাতেও এমন অর্থনৈতিক ও দলীয় বল নাই। ফ্যাসিবাদকে অতীত খুঁড়ে ইতিহাসের দাবি নিয়ে আসতে হয়। জামাতের অতীত অন্ধকার, আর শাহবাগের দ্বারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ‘এজমালিকরণ’ ঠেকাতে উজ্জ্বল অতীতের আওয়ামী লীগ ব্যর্থ। এবারো তার ভরসা ভারত। দিনের শেষে তাই একদিকে মার্কিন সমর্থিত নাশকতা-মেশিন আরেকদিকে তারুণ্যের বিদ্রোহী ইঞ্জিনই থাকছে। ফ্যাসিবাদ আর জাগরণ এই দুই পক্ষের রণধ্বনি। ইতিহাসের দুই জোট আবার মুখোমুখি। আবারো পরাশক্তির গিরিচাপে বাংলাদেশের ভবিষ্যত। এই তিন টেনশনেই নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের ভবিষ্যত রাজনীতির গতিপথ।

৩.

আন্তোনিও গ্রামশ্চির ভাষায় বললে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতিসক্রিয় হয়ে উঠেছে দুটি হিস্টরিক ব্লক। তারা দুটি স্লোগান সম্বল করেছে, জাগিয়ে তুলছে অসমাপ্ত মুক্তিসংগ্রামের জের। এই দুটি ইতিহাস-নির্ধারিত ব্লক বা জোট দুটি ঐতিহাসিক ঘটনাকে জাপটে বেঁচে আছে। ৪৭ এর পাকিস্তানবাদী ইসলামী ব্লক আর ৭১ এর বাঙালি জাতীয়তাবাদী ব্লক_ ডাক নামে পাক বাংলা বনাম জয় বাংলা। ইতিহাস সাক্ষি, সর্বজনের জয় বাংলা এই অবেলায় হারেনি, কালবেলাতেও তা জয়ের অভিলাষী। একাত্তরের অবরূদ্ধ সমাজে, শরণার্থী শিবিরে, রণাঙ্গনের জীবনের পরীক্ষায় যে জাতীয় জোট ঢালাই হয়েছিল, তা আজো জীবন্ত। সংকট মুহূর্তে তা দল-মত-বর্ণ-গোষ্ঠী-লিঙ্গ-বয়স ছাপিয়ে অতিকায় সামাজিক জোটবদ্ধতার চেহারা নেয়। হেজিমনিক ক্ষমতাসম্পন্ন এই হিস্টরিক ব্লক ধর্ম ও জাতি পরিচয়কে একাত্তরের মতো যতটা একাকার করতে পারে, পাক-বাংলার ইসলামি ব্লকের দুর্বলতা ততটাই। একাত্তরের অ্যানিটথিসিস ফলাতে ফরহাদ বলতে চান, মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি আর মুসলমানকে আলাদা করে ফেলেছে। অথচ মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে পরিচয়-দ্বন্দ্বের আখেরি মীমাংসা হয়ে গেছে। বাঙালিত্ব আর মুসলমানিত্বের বিরোধ তখনো ছিল না, এখনো আবশ্যকীয়ভাবে সেই বিরোধ নাই। নিপীড়িত বাঙাল আর মজলুম মুসলমান এক হৃদয়ের দুই প্রকোষ্ঠ হয়ে ভারসাম্য এনেছে। এরপর বাংলা-বাঙালি-বাংলাদেশকে আর হিন্দুয়ানি যেমন বলা যাবে না, বাংলা-বাঙালি-বাংলাদেশের ওপর হিন্দু বাঙালির হকও দাবানো থাকবে না। এই প্রত্যয়ই গঠন করেছে একাত্তর নামের হিস্টরিক ব্লক। সর্বজনীনতার গুণে, একাত্তরের আত্মদানের অমোচনীয় স্মৃতিতে এই ব্লক প্রাধান্য (হেজিমনি) পেয়েছে। বিপরীতে ‘ইসলাম ব্লক’ হারিয়েছে দেশ ও জাতি দুইয়েরই অধিকার। এটা ধর্মের পরাজয় নয়, ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের পরাজয়।

একাত্তরের হিস্টরিক ব্লক দলসর্বস্ব হলে সর্বজননমান্য এথিক্যাল সুপিরিয়রিটি পেত না। এর জোরেই সংকটমূহুর্তে তা শ্রেণী-ধর্ম-বয়সে একাকার হয়ে এমন সর্বপ্লাবী আবেগের সঞ্চার করে, যা দলের থেকে বড়, নেতার থেকে ক্ষমতাশালী আর সংকীর্ণ স্বার্থের চাইতে জোরালো। এই ঐতিহাসিক জোট বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের মনের অবচেতনে ঘুমিয়ে ছিল। সরকারের বিচার-লীলায় প্রতারিত হয়ে তা হঠাত আলোর ঝলকানি তুলে ফেটে পড়ে, মুখোমুখি হয় একাত্তরের অ্যান্টিথিসিসের বিরুদ্ধে। এখন থেকে বারেবারেই তা বিবিধ চেহারায় ফিরে আসবে। জয় বাংলার পাশাপাশি হয়তো আরেক বসন্তে ফিরে আসবে সোনার বাংলার দাবিও। একাত্তরের জোটকে যদি মুক্তির অ্যান্টিথিসিসকে আখেরি হার হারাতে হয়, তাহলে দলীয় খাঁচার বাইরের অজানা গন্তব্যে পা বাড়াতেই হবে। নতুন করে দেশ সৃজনের সেই দায় আমাদের সামনে। এ ভিন্ন দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ কথাটার আর সারবত্তা থাকে কী?

http://www.sachalayatan.com/faruk_wasif/9982

জনমনে নিরাপত্তা ও স্বস্তি ফিরে আসুক। যুদ্ধাপরাধের বিচার ও শাস্তি সম্পন্ন হোক।।
by Sayeed Ferdous on Friday, March 8, 2013

শাহবাগ কোন সমাজ বিপ্লবের ডাক নয় এবং শ্রেণীর লড়াইও শাহবাগের লক্ষ্য নয়। কেউ সেটা দাবিও করেনি। এই আন্দোলনে সরকারের প্রত্যক্ষ সমর্থন আর রাজনৈতিক দূরভিসন্ধি আছে, সেটাও হয়তো সত্য। কিন্ত একইসাথে লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন যে, শ্রেণী নির্বিশেষে মুক্তিযুদ্ধে স্বজন হারানো এদেশের বিরাট সংখ্যক মানুষের কষ্ট, অব্যক্ত ক্ষোভ শাহবাগে প্রকাশিত। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী শাসক আর তাদের দেশীয় দোসররা যে হত্যা, লুন্ঠন চালিয়েছে এদেশে তা কোন বিশেষ শ্রেণীর বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ ছিলোনা এবং সেকারণেই সংঘটিত ঐ অপরাধসমূহের শাস্তি দাবি করাটা আক্রান্ত সকলের পক্ষেই যায়। মধ্যবিত্তীয় নাগরিক পরিসরে, মধ্যবিত্তীয় ভাষায় কি আঙ্গিকে শাহবাগ সংগঠিত হলেও, তার গুরুত্ব তাই মধ্যবিত্তের গণ্ডীতে আবদ্ধ নয়। ১৯৯০, ১৯৫২-ও এমনকি ছিলো মূলতঃ সেক্যুলার, মধ্যবিত্তীয় এবং নগরকেন্দ্রিক। তাতে করে কি একথা বলা সম্ভব যে আন্দোলনগুলোর কোন গুরুত্ব আমাদের সমাজে, ইতিহাসে নাই? অন্যদিকে স্র্রেফ মধ্যবিত্ত পরিসরে উত্থাপিত বিধায়ই যারা ধরে নিয়েছেন যে শাহবাগের দাবিতে নন এলিট জনমানুষের সমর্থন নাই, তারা ক্যামনে সেইটা বুঝলেন? সাঈদীর জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত মানুষদের দেখে? মানুষতো ইসলামের জন্য প্রাণ দিতে চায় এবং জামায়াত দেখাইসে যে তারাই ইসলাম। কিন্তু এই প্রাণদানের অর্থ ক্যামনে প্রমাণ করে যে তারা সামগ্রিকভাবে যুদ্ধাপরাধের বিচারেরই বিরোধী?

অথচ এই অভিযোগ খাড়া করে শাহবাগকে ঘিরে চলছে ভয়ানক খেলা। সরকার বিরোধী পক্ষ, বিরোধী দল এবং জামায়াত সমর্থকরা একে রিডিউস করছেন সরকারের পোষা জমায়েত হিসেবে; তারা দেখাতে চাইছেন যে শাহবাগ রক্তপিপাসু, খুনে এবং অনায্য তার দাবি; দেখাতে চাইছেন শাহবাগ নাস্তিক, নেশাখোর এবং পতিতার আখড়া; সবচাইতে ভয়ংকর হলো এই অধার্মিক, অনৈতিক চিত্রায়নের মাধ্যমে শাহবাগকে জনবিচ্ছিন্ন ও এলিট হিসেবে দেখিয়ে দেশের আপামর মানুষের বিরুদ্ধে একে দাঁড় করানো হচ্ছে। সেক্যুলার এবং ধর্মানুগত্যের যে বিভক্তি সমাজে প্রকট ছিলোনা, যুদ্ধাপরাধ বিচার ঠেকাতে সেটাকেই জাগিয়ে তোলা হয়েছে। বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে এবং মাঠে ময়দানে বিভক্তি ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। যে প্রশ্ন এক জাহানারা ইমাম ছাড়া আর কেউ এতগুলো বছরে তুলতে পারেনি বা চায়নি, শাহবাগ সেই প্রশ্ন তুলেছে; ‘৭৫ পরবর্তী হতে শুরু করে আজ অবধি যে রাজনীতির সুবিধাবাদ যুদ্ধাপরাধীদেরকে বাড়তে দিয়েছে এযাবৎ, শাহবাগ দলীয় স্বার্থের উর্ধে উঠে তার মিমাংসা চেয়েছে। শাহবাগের আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন নানান ধরনের মানুষ; বয়স, লিঙ্গ, এথনিসিটি, ধর্মবিশ্বাস, শ্রেণী, পেশা এমনকি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে শাহবাগ বৈচিত্র্যময়। সত্য যে, যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিকে প্রবল জাতীয়তাবাদী উন্মাদনার বাইরে রাখা কঠিন; এও সত্য যে তাকে (শাসক)দলীয় সংকীর্ণ স্বার্থ গ্রাস করতে চাইবে; কিন্তু শাহবাগের বৈচিত্র্যময়তা এই প্রবণতাগুলোর বিরুদ্ধে সোচ্চার। এগুলো অস্বীকার করে শাহবাগকে ভিলেনাইজ করার মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকাতে তৎপর একদল।

অন্যদিকে সরকার পক্ষ শাহবাগের মঞ্চকে বাগে রাখতে গিয়ে বারংবার শাহবাগের সার্বজনীন চরিত্রকে বিপন্ন করেছে। তারা ভুলে গেছে, তারা ভুলে যায় আওয়ামী লীগের ডাকে এখানে মানুষ জড়ো হয়নি; আওয়ামী এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্যে মানুষ আসেনি। এই জমায়েতের স্পিরিটে আঘাত করা, তার সার্বজনীনতাকে নষ্ট করা এবং নিজেদের মোড়লগিরি দেখানোর মধ্য দিয়ে সরকার এই আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্থ করছে। অথচ এখনো প্রতিদিন-ই আমরা হত্যা/মৃত্যু/নাশকতার খবর পাচ্ছি; সাথে নতুন যোগ হয়েছে সোনার ছেলেদের চাপাতি হাতে অ্যাকশনের সচিত্র বিবরণ; মাঝে একদিন এমন খবরও এলো যে মন্দিরে আগুন লাগাতে গিয়ে এক সরকার সমর্থক হাতেনাতে ধৃত। শাহবাগে যখন দিনের পর দিন মানুষ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে রত, তখন এইসব খবর শাহবাগের স্পিরিটের মূলে আঘাত করে। আমরা যুদ্ধাপরাধের বিচার চাই কিন্তু তার জন্য কোনো সাজানো নাটক আর অস্ত্রের মহড়া চাই না। আমরা চাই বা না চাই, শাহবাগের সুফল ১৯৭১ এর ঐতিহাসিক কারণেই আওয়ামী লীগ পাবে, যেমন ঐ ঐতিহাসিক কারণেই শাহবাগে জামায়াত ক্ষতিগ্রস্থ হবে। কিন্তু এই আন্দোলনের কাঁধে বন্দুক রেখে শাসকদের অনৈতিক রাজনৈতিক সুবিধা হাসিলের চেষ্টা শাহবাগ বরদাশত করবেনা এবং আখেরে দেশের মানুষও এর জবাব নিশ্চয়ই দেবে। সরকার বরং শাহবাগের মঞ্চের মনোযোগ ছেড়ে সংসদকে কার্যকর করবার চেষ্টা করুক। বিরোধী দল সংসদীয় ব্যবস্থায় শাসনের অংশ। তাদেরকে সেই দায়িত্ব নিতে বাধ্য করুক। প্রসিকিউশন আর বিচার প্রক্রিয়াকে মজবুত করবার উদ্যোগ নিক।

চলমান এই অস্থিতিশীলতার মাঝে গত ৭ই মার্চ প্রধানমন্ত্রী ডাক দিয়েছেন পাড়ায়-মহল্লায় সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটি গঠনের। ১৮ দলীয় জোট বলেছে তারা গঠন করবে কমিটি ফর পাবলিক সেফটি। এই পাল্টাপাল্টি ঘোষণায় জনমনে অনিশ্চয়তা আরো বাড়সে। উভয় জোটের সমর্থকরাই প্রতিপক্ষের উদ্যোগকে ‘৭১ এর পাক সরকারের মদতে গঠিত শান্তি কমিটির সাথে তুলনা করছেন। দেশের মানুষ এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি আর এক মূহুর্ত দেখতে চায়না। আরো খুন, লুটপাট, দরিদ্র মানুষ, ভিন্নধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ আর সহ্য করতে মানুষ রাজি নয়।

উদ্বিগ্ন, বিচলিত মানুষ প্রশ্ন করছেন পরস্পরকে, প্রশ্ন করছেন নিজেকে যে, সরকার করছেটা কি? তারা প্রশ্ন করছেন কেন এত মৃত্যু? মৃত্যু হত্যা, নাশকতার সাথে জামায়াত-শিবিরের যে নেতা-কর্মীরা জড়িত, তাদেরকে গ্রেপ্তার এবং আইনে সোপর্দ করা হচ্ছেনা কেন? ভিন্নধর্মাবলম্বীদের ঘরবাড়ি অরক্ষিত রইলো কেন? সরকার কি আগে থাকতে পরিস্থিতি অনুমান করতে পারেনি? সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কি করে? দেয়ালে পিঠ ঠেকা মানুষ প্রশ্ন করছেন যে, সরকার কি তাহলে এই সহিংসতা জিইয়ে রাখতে চায়?

ফুটফুটে ছেলেটা বয়ঃসন্ধিতেই মারা গেল তার বাবার পাপে; বাবা গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক। ফেইসবুকে তার ছবিটা দেখলেই মনটা কেমন করে ওঠে। কতজনের চেহারা ছবি তো কোথাও আসেওনি। পুলিশ-র্য্যাব-বিজিবির গুলিতে কিংবা জামায়াতের আক্রমণে মারা গেছে মাদ্রাসা পড়ুয়া শিশু, নারী, পুলিশ, ব্লগার সহ নিরীহ মানুষ। হোক তারা জামায়াত-বিএনপি-আওয়ামী লীগ কিংবা দলগোষ্ঠির বাইরের মানুষ; হোক তারা আস্তিক কি নাস্তিক, কি সন্ত্রাসী; নাম জানা, না-জানা এই মৃত্যুগুলোর একটিও সমর্থন যোগ্য নয়।

শিবির-জামায়াতের হামলা, নাশকতা ঠেকাতে মানুষ নিজেরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারে, প্রতিরোধ গড়তে পারে; এবং সেটা তারা করছেও। কিন্তু মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নিক সেটা নিশ্চয়ই কারো কাম্য নয়। সরকার যদি আরো রক্তপাত, লুটতরাজ বাড়তে দিতে না চায়, তো সময় থাকতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিক; অপরাধী যেই হোক তাকে আইনে সোপর্দ করুক। জনমনে নিরাপত্তা ও স্বস্তি ফিরে আসুক। যুদ্ধাপরাধের বিচার ও শাস্তি সম্পন্ন হোক।

2 thoughts on “We must return to class politics

  1. Let us analyze the main photo of this blog. This was a photo of womens’ day rally and post rally lathi michil. Women took over lathi at Shahbag rally – its has a highly symbolic value. But once one look at this photo of high symbolic value – one has to get sad. In this women’s day rally there are no more than 20 women in first two rows. Of the 20 women about 10-12 are holding the lathi – most of them are leader type – respected Khushi Kabir, Gonojagoron Mancha leader Lucky Akhter etc. Behind the women there are men with lathi also.

    What does this photo says about the whole movement, especially when on the other side of this fight real women are dying in police fire?
    Do anyone remember the photo of 1971? White uniform clad girls parading carrying rifle and sticks. In that photo there were at least hundred girls. And they were facing a ruthless foreign military.

  2. রিকনসিলিয়েশনের রাজনীতিটা বোঝা গেলো। একদিকে গণহত্যার দোহাই। আরেকদিকে সামরিক শাসনের ভয় দিয়ে সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে চেপে রাখা। মাঝ দিয়ে জামাত যে ধ্বংস আর হত্যার রাজনীতি চালিয়ে দেশে বিদেশে সেইভ মুসলিম জিকির তুললো সেটা বাংলাদেশের ভাব্মুর্র্তিকে কোথায় নিয়ে গেল? আপনি রিকনসিলিয়েশন বোঝাতে পারবেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলকে, লাশ হয়ে ফেরা পুলিশ সদস্যদের, গ্রামের মানুষকে যারা চাদ দেখে ধর্ম উদ্ধার করতে গিয়েছিল?

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s