Binayak Sen: Why Should I Be A “Minority”?

© Prothom Alo
© Prothom Alo

Minority vs Freedom of Identity
by Dr Binayak Sen/ Prothom Alo, March 9 & 11, 2013

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা এভাবেই বারবার আক্রমণের শিকার হবেন?বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা এভাবেই বারবার আক্রমণের শিকার হবেন?

Am I am minority? In one sense, asking the question is absurd. My own family surname already says what I am. It doesn’t even make sense to debate this. But the matter may not be straight forward either. Today the word “minority” is being used to indicate “minor in number” or something like that. But someone can be larger in numbers and still be a practical minority. In the world, women are the majority in number, even after bias against daughters. And yet can we say women are the majority?

অতি-সংখ্যালঘু: সংখ্যালঘু বনাম আত্মপরিচয়ের স্বাধীনতা
বিনায়ক সেন | তারিখ: ১০-০৩-২০১৩
প্রথম কিস্তি

আমি কি সংখ্যালঘু? এক অর্থে প্রশ্ন রাখাটাই হাস্যকর। আমার পারিবারিক সূত্রে পাওয়া নামই বলে দিচ্ছে আমি কী। এ নিয়ে বাহাস করার অর্থই হয় না। তবে বিষয়টা অত সরল না-ও হতে পারে। আজকাল সংখ্যালঘু কথাটার ‘সংখ্যায় লঘু’ এমন একটা কোনো সংজ্ঞা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কিন্তু সংখ্যায় মেজরিটি হয়েও কেউ কার্যত মাইনরিটি হতে পারে। সারা বিশ্বে নারীদের সংখ্যা পুরুষদের চেয়ে বেশি, শিশুমৃত্যুর হারে অনেক বৈষম্য থেকে যাওয়ার পরেও। তারপরও কি আমরা বলতে পারি যে নারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ? সংখ্যায় বেশি হওয়ার পরেও সংখ্যালঘুর মতো অধস্তন অবস্থান তাদের। তার মানে ব্যাপারটা শুধু সংখ্যায় (নিউমেরিক্যালি) বেশি-কমের বিবেচনা নয়। মূল প্রশ্নটা হচ্ছে—কে কত বেশি ক্ষমতাবান? নারীরা পুরুষদের চেয়ে এখনো কম ক্ষমতাবান বলেই সংখ্যায় বেশি হয়েও তারা সংখ্যালঘু। সুতরাং সংখ্যায় বেশি-কম যা-ই থাক না কেন, কোনো সামাজিক গোষ্ঠী বা গ্রুপ বা ব্যক্তি ‘ক্ষমতা হারিয়ে’ কীভাবে সংখ্যালঘু ‘হয়ে ওঠে’, সেটিই হচ্ছে প্রথম বিচার্য বিষয়। ৮ মার্চ নারী দিবস উপলক্ষে প্রথম আলো আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় অনেকেই বলেছেন, নারীরা ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক’। যখন আপনি সংখ্যালঘু হয়ে ওঠেন, তখন আপনি নিজেকে ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক’ ভাবতে শুরু করেন। জ্যাঁ পল সার্ত্র বলেছিলেন, একজন ইহুদি হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যাকে অ্যান্টি-সেমিটিকরা ইহুদি বলে ডাকে। তাঁর কথার সূত্র ধরে বলা যায়, একজন সংখ্যালঘু হচ্ছে সেই মানুষ, যাকে একজন সংখ্যাগুরু সংখ্যালঘু বলে ডাকে, যেমন: ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত কোনো ব্যক্তি নিজেকে ‘উপজাতি’ বলে পরিচিত করে না, তাকে ‘উপজাতি’ বলে কোনো বৃহৎ নৃগোষ্ঠীর মানুষ।

সমাজে প্রতিটি ব্যক্তিরই নানা পরিচয় থাকে। কোন পরিচয়ে কে কখন কতটা নিজেকে জাহির করবে, সেই স্বাধীনতাটা সবার সমান নয়। আত্মপরিচয় (আইডেনটিটি) জাহির করার স্বাধীনতা যে সমাজে যত বেশি, সেই সমাজে ব্যক্তির স্বাধীনতাও তত বেশি এবং সেই সমাজও তত বেশি উন্নত। অমর্ত্য সেন তাঁর আইডেনটিটি অ্যান্ড ভায়োলেন্স বইয়ে নিজের বিভিন্ন পরিচয় তুলে ধরেছেন। আমার অক্ষম অনুবাদে তা দাঁড়ায় এমন: ‘আমি একই সঙ্গে হতে পারি একজন এশীয়, একজন ভারতীয় নাগরিক, একজন বাঙালি, যার রয়েছে বাংলাদেশি পূর্বপুরুষ, একজন মার্কিন দেশে বা ব্রিটেনে বসবাসকারী, একজন অর্থনীতিবিদ, দর্শনচর্চায় অনুপ্রবেশকারী, একজন লেখক, একজন সংস্কৃত ভাষায় বিশেষজ্ঞ, সেক্যুলারিজম ও গণতন্ত্রে জোরালোভাবে বিশ্বাসী, একজন পুরুষ, একজন নারীবাদী, একজন “হেটেরোসেক্সুয়াল”, কিন্তু সমকামীদের অধিকারের পক্ষাবলম্বনকারী, যার জীবনযাত্রার ধরন কোনো বিশেষ ধর্মের সঙ্গে খাপ খায় না (নন-রিলিজিয়াস), সে এসেছে হিন্দু সামাজিক পটভূমি (ব্যাকগ্রাউন্ড) থেকে, সে অ-ব্রাহ্মণ, এবং সে বিশ্বাস করে না মৃত্যু-পরবর্তী কোনো জীবনে (আফটার লাইফে), বা এই প্রশ্ন যদি তাকে করা হয়, সে এ-ও বলবে—সে বিশ্বাস করে না কোনো পূর্ব-জন্মেও। এটা হচ্ছে বিভিন্ন আত্মপরিচয়ের একটি ক্ষুদ্র নমুনা-চয়ন, যার প্রতিটাতেই আমি হয়তো একই সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত—এবং চাইলে এ রকম আরও অনেক পরিচয়ের সদস্য হতে পারি আমি; সবকিছুই নির্ভর করবে পরিস্থিতির বিচারে কোন পরিচয়টা সেই মুহূর্তে আমাকে বেশি টানছে, তার ওপর।’ অমর্ত্য সেনের স্বাধীনতা আছে বিভিন্ন পরিচয়ের মধ্যে লাগসই পরিচয়টা অবস্থাভেদে, পছন্দ অনুযায়ী ও রুচির বিচারে বেছে নেওয়ার। এই ‘বাছাইয়ের স্বাধীনতা’ সবার থাকে না, সব শ্রেণীর থাকে না, সব সমাজে থাকে না।

অমর্ত্য সেন বইটি লিখেছিলেন যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ করে প্রচারিত হয়েছিল ‘সভ্যতার সংঘাত’-এর তত্ত্ব। সংঘাত বলতে পাশ্চাত্য ও ইসলামি সভ্যতার মধ্যে এক মূলগত দ্বন্দ্বের ‘আবিষ্কার’ করেছিলেন স্যামুয়েল হান্টিংটন ও তাঁর অনুসারীরা। ২০০১-এর ১১ সেপ্টেম্বরের পরে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের নানাভাবে পাশ্চাত্যের শত্রু বানিয়ে এই তত্ত্বকে বাস্তবেই কাজে লাগানো হয়েছিল। তারই বুদ্ধিবৃত্তিক সমালোচনা ও প্রতিবাদ হিসেবে অমর্ত্য সেন ২০০৬ সালে বইটি লিখেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, পাশ্চাত্য ও ইসলামের মধ্যে এই বিরোধ আবিষ্কার ছিল একটি দুষ্ট-পরিকল্পনা। প্রথাগত সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পর সারা বিশ্বকে এক পরাশক্তির অধীনে আনার ও সর্বত্র আঞ্চলিক যুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ‘সভ্যতার সংঘাত’-এর তত্ত্ব জোরেশোরে অনুসৃত হয়েছিল। কিন্তু অমর্ত্য সেন এই বই লেখার আরও বহু বছর আগে থেকেই আমি আবছা করে বুঝতে পেরেছিলাম, প্রতিটি ব্যক্তিকেই কোনো বিশেষ আত্মপরিচয়ে সমাজ বা রাষ্ট্র বা ধর্ম বেঁধে দিতে পারে না। কোন পরিচয়ে সে নিজেকে কখন পরিচিতি করাতে চায়, সেই ‘বাছাইয়ের স্বাধীনতা’ তার চাই—এটা তার মৌলিক মানবিক অধিকার। এবং সে কারণেই কৈশোর থেকেই কেউ আমাকে ‘সংখ্যালঘু’ বললে আপত্তি করেছি, পারলে প্রতিবাদ করেছি, না করলেও মেনে নিইনি।

এর জন্য আমার পারিবারিক ঐতিহ্যও কিছুটা দায়ী। আমি এখানে কোনো ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতার কথা তুলছি না। আমার ধারণা, এ রকম অভিজ্ঞতা আরও অনেকের জীবনেই হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। সেটা মনে রেখেই দু-একটি আত্মজৈবনিক তথ্য যোগ করব এখানে। ব্যাখ্যার প্রয়োজনেই এই আত্মকথন—তার জন্য আগেই তত্ত্বজ্ঞ পাঠকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আমার মা ধর্মপ্রাণ ছিলেন, কিন্তু কোনো বিশেষ ধর্মের মধ্যে তাঁর পরিচয়কে সীমিত রাখেননি। ঈদে বা শবেবরাতের অনুষ্ঠানে নিজে উৎসাহ নিয়ে অংশগ্রহণ করতেন, বাসায় হিন্দু-মুসলিমনির্বিশেষে দাওয়াতও দিতেন। উৎসবে বা সংকটে পড়লে মাজারে ‘মানত’ করা ছিল তাঁর সংসারের প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এ ক্ষেত্রে তাঁর নিজস্ব কিছু ‘ভোকাবুলারি’ ছিল। হাইকোর্টের মাজার ‘গরম পীরের মাজার’, ফলে মাজারের পাশ দিয়ে গেলে হাত তুলে শ্রদ্ধা জানানো চাই। নইলে আধ্যাত্মিক গুরু রুষ্ট হবেন। মিরপুরের মাজার আবার ছিল ‘ঠান্ডা পীরের মাজার’—তিনি দুর্বাসা মুনি নন, সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতিতে দোষ নেন না। আমাদের বাসায় জন্মাবধি দেখেছি নানা সময়ে বিভিন্ন মুসলমান আধ্যাত্মিক জ্ঞানসম্পন্ন পুণ্যবান ব্যক্তিরা এসেছেন। তাঁদের যথাবিহিত যত্ন করা হয়েছে। ফলে নিজেকে ‘সংখ্যালঘু’ ভাবার কোনো যুক্তি শৈশব থেকেই পাইনি। মা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাতেন—যদি হিন্দু ধর্মে তাঁর অন্তর্ভুক্তিকে ভারতমুখিনতার সঙ্গে সমীকরণ করা হতো। পাড়ার বাজারে পেঁয়াজ কিনতে গেলে যদি বিক্রেতা তাঁকে বলত, ‘দাদি, আপনাদের দ্যাশ থেকে আইছে।’ মা উত্তরে বলেছেন, ‘তাই নাকি, জানতাম না তো সিলেটে আজকাল এসব পেঁয়াজ হচ্ছে,’ এবং তারপরেই তিরস্কার করে বলে উঠতেন, ‘দাদির সঙ্গে ফাজলামি করার আর বিষয় পাওনি, না?’ বিক্রেতা লজ্জিত হতো, ‘না, দাদি, ভুল হয়ে গেছে’—এমনটাই বলত। তিনি বাজারের সবার কাছে ছিলেন ‘সর্বজনীন দাদি’। শুনেছি, মৃত্যুর পরে তাঁর মৃতদেহ শেষবারের মতো দেখার জন্য অনেক লোক তাঁর বাসায় জড়ো হয়েছিলেন, যাঁদের প্রায় সবাই ছিলেন মুসলমান। আমার ধারণা, আমার বাবাও এই মতেরই মানুষ ছিলেন। দীর্ঘ ২৪ বছর তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ছিলেন—অসংখ্য ছাত্র ১৯৫৮ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত সে প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়েছে। মানুষ বড়ই রহস্যময় জীব। আমি মৃত্যুর পরে তাঁকে একবার মাত্র স্বপ্নে দেখেছি, কিন্তু তাঁর পূর্বতন (মুসলমান) ছাত্ররা ও সহকর্মীরা—যাঁরা পরবর্তী সময়ে উচ্চতর পদে আসীন হয়েছিলেন—তাঁকে নাকি অনেকবারই স্বপ্নে দেখেছেন এবং সদা-হাস্যোজ্জ্বল মুখচ্ছবিতে দেখেছেন। তাঁরা ফোন করে বা দেখা করে আমাকে তা বলার তাগিদ অনুভব করেছেন। আমি পারমার্থিক বিষয়ে নিবিষ্ট নই, কিন্তু আমার শুধু বলার কথা—হিন্দু-মুসলমান আত্মপরিচয়ের বিভিন্নতা সেখানে কোনো বাধার সৃষ্টি করেনি। ফলে আমার পক্ষে, নিজেকে ‘সংখ্যালঘু’ ভাবা কখনোই সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

দ্বিতীয় একটি কারণও ছিল। আর সেটা মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে। আমার বাবা অধ্যক্ষ বি বি সেন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন সংগঠকের ভূমিকায়। প্রবাসী বাংলাদেশের সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে তিনি ১৯৭১ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নিয়োজিত ছিলেন সমগ্র নর্থ-ইস্ট সেক্টরের ‘এডুকেশন অফিসার’ হিসেবে। শিলংয়ে সে সময় বাংলাদেশ সরকারের একটি অস্থায়ী কার্যালয় ছিল। কাজটা ছিল রিলিফ ও মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্পের পরিচালনার কাজে অংশ নেওয়া। ১৭ ডিসেম্বর ভারতীয় মিত্রবাহিনীর একটি দলের সঙ্গে তিনিও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঢাকায় প্রবেশ করেন। তারপর আবার ফিরে গেছেন তাঁর পূর্বতন কর্মক্ষেত্রে অধ্যক্ষ হিসেবে। এ দেশে বীরাঙ্গনাদের প্রথম কারিগরি প্রশিক্ষণ শুরু হয় ১৯৭২-৭৩ সালে তাঁর পরিচালিত প্রতিষ্ঠানেই। মুজিবনগর সরকারে যাঁরা কাজ করেছেন তাঁরা সবাই নাকি একটি করে ‘প্রমোশন’ পেয়েছিলেন। সেদিক থেকে তিনি ছিলেন এর ব্যতিক্রম। তবে স্বীকৃতি বা পদোন্নতি নিয়ে তাঁর মনে কখনো ক্ষোভ ছিল না। এই না-পাওয়াটাকে তিনি তাঁর ‘সংখ্যালঘু’ পরিচিতির সঙ্গে কখনোই যুক্ত করেননি। দুবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি। একবার পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ সন্ধ্যার মুখে। সেবার পাঞ্জাবি ব্রিগেডিয়ার তাঁর পাকিস্তানি বস-এর ছোট ভাই হওয়ায় তিনি প্রায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। আরেকবার এই স্বাধীন বাংলাদেশে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন কোনো অব্যাখ্যাত কারণে ১৯৭৫-এর নভেম্বরে, সেনা-অভ্যুত্থানের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে (বর্তমান লেখকসহ)। এই গ্রেপ্তার ছিল ভুল-বোঝাবুঝির, গ্রেপ্তার এবং যাঁরা এটা করেছিলেন তাঁরা পরবর্তী সময়ে তাঁদের উপাত্তগত ভুল বুঝতে পেরে অত্যন্ত বিব্রতবোধ করেছিলেন। সে রকম শুনেছি। তবে আমার গর্বের ব্যাপার যে আমার বড় ভাই ছিলেন একজন লড়াকু মুক্তিযোদ্ধা। মুজিববাহিনীতে নয়, সে সুযোগও তাঁর ছিল। তিনি সরাসরি মুক্তিবাহিনীতে (এফএফ) যোগ দেন ৪ নম্বর সেক্টরে। জানের তোয়াক্কা না করে তিনি যুদ্ধ করেছেন এবং তাঁকে আমরা সারা শরীরে জোঁকে-খাওয়া অবস্থায় দেখতে পাই নয় মাস যুদ্ধের পরেই। কিছুদিন ছাত্রলীগের ঢাকা কলেজ শাখার দায়িত্বপূর্ণ কাজেও ছিলেন, কিন্তু তদানীন্তন নেতৃত্বের সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণে ১৯৭৪ সালেই ছাত্রলীগ থেকে অব্যাহতি নেন। সেটাও (পরে শুনেছি) স্বাধীনতার পরে ‘সংখ্যালঘু’ শব্দটা একজন প্রখ্যাত ছাত্রনেতার মুখ গলে তাঁর কানে এসে পৌঁছেছিল, বা এমনই কিছুর প্রতিবাদে। এরপর বাদবাকি জীবনটা প্রায় প্রবাসেই কাটালেন কোনো প্রবল অভিমান বুকে নিয়ে। এই মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের গর্বিত সদস্য হিসেবে ‘সংখ্যালঘু’ আত্মপরিচয়টা মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর মতো আমারও আপত্তির যথেষ্ট কারণ ছিল ও আছে।

তৃতীয় একটি কারণও রয়েছে, তবে সেটা মোটামুটি প্রকাশ্যেই ধারণ করে এসেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই বামপন্থী মতাদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হই এবং কালক্রমে কমিউনিস্ট রাজনীতির সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছিলাম। ফলে নিজেকে ‘সংখ্যালঘু’ ভাবার কোনো কারণ ছিল না, কেননা পার্টিতে মণি সিংহ বা মোহাম্মদ ফরহাদ, জিতেন ঘোষ বা হাতেম আলী, মণিকৃষ্ণ সেন, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, রণেশ দাশগুপ্ত, অজয় রায়, মতিউর রহমান বা মনজুরুল আহসান খান—এসব নামের মধ্যে কোনো সম্প্রদায়গত বিবেচনাবোধ কখনোই মনে স্থান পাওয়ার প্রশ্নই ওঠেনি। আমার প্রথম ও প্রধান আত্মপরিচয় ছিল—আমি সমাজ-অর্থনীতি-রাষ্ট্রের প্রগতির পক্ষের লোক। আমাকে ‘সংখ্যালঘু’ বললেই (বলতে পারেন অনেকেই) আমি তা মানব কেন? ঠিক একইভাবে, পারিবারিক দিক থেকে একটি প্রগতিশীল রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আবহে বড় হওয়ার কারণে আমার স্ত্রীও (যতই তাঁকে বোঝানো যাক) নিজেকে এখনো ‘সংখ্যালঘু’ বলে ভাবতে চান না বা পারেন না।

মোট কথা, অমর্ত্য সেনের দার্শনিক গ্রন্থটা পড়ার আগে থেকেই আমি বুঝতে শিখেছিলাম যে বিভিন্ন আত্মপরিচয়ের মধ্যে কোন পরিচয়টা কখন কী পরিমাণে আমি জাহির করব, সে স্বাধীনতাটা আমাকে দেওয়া দরকার বা আমার অর্জন করা দরকার। কিন্তু এসব কথা আমি বাঁশখালীর ওই সংখ্যালঘুতে পরিণত হওয়া মাতৃসমা নারীটিকে বোঝাব কী করে? বস্তুত, আমি তাঁকে সংখ্যালঘুও বলতে চাইছি না। তাঁর পরনের পোশাক, তাঁর ঘর-গৃহস্থালি, তাঁর পরিবেশ-প্রকৃতি আমাকে বলে দিচ্ছে, অন্য কোনো শব্দবন্ধ প্রযুক্ত হওয়া দরকার এ ক্ষেত্রে। আমি তাঁকে অনন্যোপায় হয়ে বলছি—তিনি আসলে অতি-সংখ্যালঘু।

আগামীকাল দ্বিতীয় কিস্তি: অতি-সংখ্যালঘুর ওপরে আক্রমণ: প্রচলিত ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতা

বিনায়ক সেন: অর্থনীতিবিদ ও প্রাবন্ধিক।

binayaksenbd.com

http://www.prothom-alo.com/detail/date/2013-03-10/news/335217

উপর্যুপরি আক্রমণ: প্রচলিত ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতা

বিনায়ক সেন | তারিখ: ১১-০৩-২০১৩

দ্বিতীয় কিস্তি
সংখ্যালঘুর ওপর আক্রমণ-নির্যাতন বিভিন্ন যুগে হয়েছে। তবে ধারণা করা যায় যে প্রাক-ঔপনিবেশিক, ঔপনিবেশিক, আধা-ঔপনিবেশিক ও আধুনিক আমলে এই নির্যাতনের ভিন্ন ভিন্ন কারণ ছিল। এসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দিয়ে ২০১২ বা ২০১৩ সালের সংখ্যালঘু নির্যাতনকে ঠিক ব্যাখ্যা করা যায় না। এটাই এখানে আমার মূল বক্তব্য।

কিন্তু তার আগে আমাকে বাঁশখালীতে ফিরে যেতে হবে। আমি সেখানে যাইনি। অনেকের মতো আমিও সেই বিপর্যস্ত নারীকে দেখেছি টিভির পর্দায়, বিভিন্ন চ্যানেলে, দগ্ধ ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ভূলুণ্ঠিত অবস্থায় কাতরস্বরে কী যেন বলছেন এবং পরমুহূর্তে আবার চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ইতস্তত বিক্ষিপ্ত তাঁর এত দিনকার গৃহস্থালির অবশিষ্টাংশ ও পোড়ামাটির ধুলায় ক্লান্তিতে কান্নায় শুয়ে পড়ছেন—এ রকম একটা ছোট্ট ‘ক্লিপ’ আমাদের দেখানো হয়েছে। আমি তাঁর নাম পর্যন্ত জানি না। কিন্তু মাতৃসমা এই নারী আমাকে পেয়ে জানতে চাইতেই পারেন, ‘বাবা, এই যে এসব ঘটে গেল, এটা কেন হলো, এর ব্যাখ্যা কী?’ ফলে প্রচলিত ব্যাখ্যাগুলোকে আবারও বিস্মৃতি থেকে টেনে আনতে হচ্ছে কেবল তাঁর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য, যেপ্রশ্ন তিনি কখনোই আমাকে করেননি বা হয়তো কাউকেই করেননি বা সম্ভবত কোনো দিনই করবেন না। তবে তাঁর ঘর-গৃহস্থালির অবশেষ দেখে এবং শুধু তাঁর নয়, অধিকাংশ মানুষ যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সম্প্রদায়কেন্দ্রিক এই আক্রমণে, তাঁদের সহায়-সম্পত্তি দেখে—এ রকম ধারণা আমার জন্মেছে যে তাঁরা কেউই উচ্চবর্গের নন। এমনকি শহরে মধ্যবিত্তের যে জীবনমান তার চেয়েও বেশ কিছুটা নিচুতেই তাঁদের অবস্থান বোধ করি। বস্তুত, আক্রমণের পর তাঁদের ঘর-গৃহস্থালির যে চেহারা দেখানো হয়েছে টিভির পর্দায় বা পত্রিকার স্থিরচিত্রে, তাতে করে প্রথমেই যে প্রশ্নটা জেগেছে আমার তা হলো—এখান থেকে লুটপাটের কী পেল দুর্বৃত্তরা? এঁরা হয়তো ভূমিহীন চরম দরিদ্র পরিবারের কেউ নন, কিন্তু মধ্যবিত্তের সম্পদ-জমি ইত্যাদি সংজ্ঞায় এঁরা পড়েন কি না এ নিয়ে শেষাবধি সন্দেহ থেকেই গেল। সম্পদ বলতে একটা ভিটেমাটি, চালাঘরের মধ্যে একটা খাট বা বড়জোর একটা আলনা, কিছু ঘটি-বাটি, একটা দুটো চেয়ার-টেবিল বা বড়জোর কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটা ছোট্ট টিভি। এঁরা গ্রামবাংলার ধ্রুপদি গরিব কৃষক বা ছোট্ট মফস্বল শহরের বা বাজার-উপজেলা কেন্দ্রের খুদে ব্যবসায়ী। প্রথাগত অর্থে সংখ্যালঘু বলতে মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী যে শ্রেণীটিকে বোঝানো হয়ে থাকে, এঁদের স্থান তার থেকে অনেক নিচে—সামাজিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক সম্পদ, শিক্ষার মান যেকোনো মানদণ্ডেই তাঁদের বিচার করুন না কেন। এই কারণে আমি এঁদের ‘অতি-সংখ্যালঘু’ বলছি। এরা আলট্রা-পুওরের মতোই আলট্রা-মাইনরিটি।

সংখ্যালঘুর ওপর আক্রমণ-নির্যাতনের যেসব প্রচলিত ব্যাখ্যা রয়েছে তা উচ্চারিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে কোনো বিশেষ ঘটনাকে বিশ্লেষণ করার জন্য। এর কোনোটা লেখা হয়েছে ঔপনিবেশিক আমলে ঘটে যাওয়া দাঙ্গাগুলোকে বোঝার ক্ষেত্রে (যেমন ১৮৮০ সাল থেকে শুরু করে ১৯২৬-এর দাঙ্গার কারণ ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে)। কোনোটা লেখা হয়েছে পার্টিশনের আগের (১৯৪৬ সালের) দাঙ্গা বোঝার তাগিদ থেকে। কোনোটা লেখা হয়েছে পার্টিশনের পরের (১৯৫০ বা ১৯৬৪ সালের) দাঙ্গার প্রকৃতি অনুধাবনের জন্য। স্বাধীনতার পর এ দেশে ১৯৯২ সালের বা ২০০১ সালের সাম্প্রদায়িক আক্রমণ-নির্যাতন নিয়েও কিছু লেখালেখি হয়েছে। এসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ যেসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে দাঁড় করানো হয়েছিল সেসব ঘটনা বোঝার ক্ষেত্রেও এগুলো যথেষ্ট ছিল কি না সে বিষয়েও আমার কিছুটা সংশয় রয়েছে। কিন্তু আমি এখানে সেসব বিচারে যাব না। আমি ধরে নেব এসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ন্যায্যতা রয়েছে। আমি শুধু দেখব যে এসব ডিসকোর্স দিয়ে ২০১৩ সালের সাম্প্রদায়িক নির্যাতনকে ব্যাখ্যা করা চলে কি না।
হিন্দু ও মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব লক্ষ করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন যে একই আলো-হাওয়ার মধ্যে শত শত বছর বাস করেও ‘যাহা মনুষ্যচিত, যাহা ধর্মবিহিত’ সে রকম একটি সম্পর্ক ‘আমাদের মধ্যে হয় নাই’ এবং এই অর্থে আমাদের মধ্যে ‘একটি পাপ আছে’ ও ‘এই পাপ বহুদিন হইতে চলিয়া আসিতেছে’। এটা স্বীকার না করলে ‘এই পাপ থেকে আমাদের নিষ্কৃতি নাই’। এর থেকে আভাস মেলে যে প্রাক-ঔপনিবেশিক আমলেও, বিচ্ছিন্ন হলেও, মাঝেমধ্যেই দ্বন্দ্ব-সংঘাত হয়েছে; উগ্র ব্রাহ্মণ্যবাদের সঙ্গে নিয়ম না-মানা চৈতন্যপন্থী, সহজিয়া ও বৈষ্ণব মতের যেমন, তেমনি সমতাবাদ অনুসারী নব্য ধর্মমত ইসলামের সঙ্গেও। তবে সে আমলে অতি-শাস্ত্র মানা বিশুদ্ধপন্থীদের সঙ্গে শাস্ত্র হুবহু না-মানা অবিশুদ্ধপন্থীদের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে এক ধরনের সামাজিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মধ্যযুগীয় সমাজে; ফলে দ্বন্দ্ব থাকলেও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় তা পর্যবসিত হয়নি সেকালে। এই অবস্থাটা উনিশ শতকের বাংলায়ও বহুকাল অবধি ছিল। ফরায়েজি-ওহাবি শুদ্ধাচরণের মতের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবেই গড়ে উঠেছিল লালন ও তাঁর অনুসারীদের সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ। তখনকার সমাজ এ রকম নানা মতবাদ ও ঐতিহ্যকে ধারণ করতে পেরেছিল বলেই সামাজিক ভারসাম্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মতো বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় দেখা দেয়নি। এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থাটা ১৮৮০ সালের পর থেকে ক্ষয়ে যেতে থাকে। এর পেছনে দায়ী জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সাম্প্রদায়িক উত্থান, যা বঙ্কিম-প্রদর্শিত বাহুবলের তত্ত্বকে ঘিরে আবর্তিত হতে থাকে পরবর্তী দশকগুলোয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, বাঁশখালীর ওই প্রৌঢ়া নারীর পরিবারের ওপর আক্রমণ-নির্যাতনকে এই দ্বন্দ্ব দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় কি না? প্রথমেই আমাদের মনে পড়বে জমিদার-কৃষক দ্বন্দ্বের তত্ত্বের কথা। হিন্দু জমিদার বনাম মুসলমান কৃষক এই শ্রেণীগত দ্বন্দ্বের সাম্প্রদায়িকীকরণের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান অনিবার্যভাবে জন্ম নিল—এমন মত পাওয়া যাবে কোনো কোনো ঐতিহাসিকের রচনায়। জমিদার বনাম কৃষক এই শ্রেণীগত দ্বন্দ্ব যে সাম্প্রদায়িক পরিণতিতে গড়াতে পারে তার আভাস রবীন্দ্রনাথের ঘরে-বাইরে উপন্যাসে বিশদভাবেই পাওয়া যায়। তবে বাঁশখালীতে, বেগমগঞ্জে বা বাগেরহাটে যাঁরা নির্যাতিত হয়েছেন, তাঁদের ঠিক ঘরে-বাইরে-এর নিখিলেশের শ্রেণীতে ফেলা যায় না—এতে আশা করি কম-বেশি সবাই একমত হবেন। ১৯০৫-০৭ সালের ‘স্বদেশি আন্দোলন’ চলাকালীন বঙ্গভঙ্গ রোধে সেভাবে মুসলমান কৃষকেরা অংশ নেয়নি। এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন যে কৃষকেরা ভেবেছিল, বাবুরা তো এমনিতে তাদের কাছে আসেন না, ‘বাবুরা বোধকরি বিপদে পড়িয়াছে’ বলেই এখন তাদের কাছে এসে স্বদেশি প্রচারণা চালিয়ে সাহায্য চাইছেন। কিন্তু বাঁশখালীর ওই প্রৌঢ়া নারীর পরিবারকে বা উপজেলা কেন্দ্রের আক্রমণের শিকার খুদে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে ঠিক ধ্রুপদি অর্থে ‘হিন্দু বাবু’ বলা চলে না বোধকরি।

১৮৮০ সাল থেকে ১৯৪৭-এর দেশভাগ পর্যন্ত সংঘটিত বিভিন্ন দাঙ্গার একটি মেইনস্ট্রিম ব্যাখ্যা হলো, হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সাধারণভাবে ব্যাপক কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না। ব্যাপক দ্বন্দ্ব ছিল এবং দ্বন্দ্ব বাড়ছিল এ দুই সম্প্রদায়ের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত ও মুসলমান মধ্যবিত্ত প্রতিযোগিতা করছিল চাকরি, ব্যবসা, প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানা খাতে নিজেদের ক্ষমতাবান করতে। একসময় সে প্রতিযোগিতা সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বের রূপ নেয় ও এর পরিণতিতে এমনকি তা দাঙ্গা-আক্রমণ-নির্যাতন পর্যন্ত গড়ায়। ১৯০৫ সাল থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত কালপর্ব নিয়ে লেখা হুমায়ূন আহমেদের মধ্যাহ্ন উপন্যাসে এ রকম দ্বন্দ্বের বিস্তার কীভাবে গ্রাম এলাকায় ক্রমেই ছড়িয়ে পড়েছিল তার সত্যনিষ্ঠ বিবরণী পাই। ক্রমেই জমিদার নিয়ামত হোসেন ও অত্যাচারী শশাংক পালের জায়গা নিচ্ছিল উঠতি ধনিক ধনু শেখ। তবে দুই সম্প্রদায়ের শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যে ক্রমবর্ধমান স্বার্থচিন্তার তত্ত্বও বাঁশখালী, বেগমগঞ্জ, বাগেরহাটের ২০১৩ সালের সাম্প্রদায়িক আক্রমণ-নির্যাতন-দাঙ্গাকে ঠিক ব্যাখ্যা করতে পারে না। নির্যাতিত পরিবারগুলোকে কোনোভাবেই ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত উঠতি মধ্যবিত্ত বলে মনে হয়নি আমার। এরা আদৌ কোনো আকর্ষণীয় সরকারি বা বেসরকারি খাতের চাকরিতে নিয়োজিত কি না সে বিষয়েও সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে।

১৯৫০ ও ১৯৬৪ সালের দুটো বড় দাঙ্গা পূর্ব পাকিস্তানে থেকে যাওয়া হিন্দু সম্প্রদায়ের অবশিষ্ট সামাজিক ভিতকেও ভেতর থেকে নড়িয়ে দিয়েছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির পরেও দেশভাগের দাঙ্গার প্রাথমিক আঘাত সামলে উঠে হিন্দু জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ পূর্ব পাকিস্তানে রয়ে গিয়েছিল। ১৯৪১ সালে এই বঙ্গে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ২৮ শতাংশ। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ঠিক আগের বছরে এদের সংখ্যা ছিল ২২ শতাংশ। ১৯৭৪ সালের পরিসংখ্যানে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪ শতাংশে। ২০১১ সালে এটা আরও নেমে দাঁড়িয়েছে ৯ শতাংশে। ১৯৫০ ও ১৯৬৪ সালের দাঙ্গাগুলোর পেছনে মূলত দায়ী করা হয় বৈরী রাষ্ট্রশক্তিকে এবং সেই শক্তির সমর্থক মুসলিম লীগের রাজনীতিকে। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর শত্রু-সম্পত্তি আইন যারা জমি-বাড়ির মালিক, সেসব হিন্দু পরিবারের সামাজিক-অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও দুর্বল করে দেয়। বস্তুত, দাঙ্গার মাধ্যমে যতটা ক্ষতিসাধন হয়েছে এই শ্রেণীর, তার চেয়েও বেশি ক্ষতি হয়েছে শত্রু-সম্পত্তি আইনের প্রয়োগের মধ্য দিয়ে। কিন্তু এই ব্যাখ্যাও হাল আমলের সাম্প্রদায়িক নির্যাতনকে বুঝতে সাহায্য করে না। রাষ্ট্রক্ষমতায় আজ সাম্প্রদায়িক বৈরী শক্তি অধিষ্ঠিত নেই। নেই মুসলিম লীগের মতো কোনো শাসক দলও। শত্রু-সম্পত্তি আইন সাধারণভাবে সারা দেশেই এখনো বিদ্যমান—এই পাপ আপনার, আমার, সবার—কিন্তু বিশেষভাবে বাঁশখালী, বেগমগঞ্জ বা বাগেরহাটের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর কেন রাষ্ট্রশক্তি বা তার সহযোগী স্থানীয় সামাজিক শ্রেণী-দলগুলো চড়াও হতে যাবে কেবল সম্পত্তি দখলের জন্য, তার সপক্ষে যুক্তি মেলা ভার। এই অতি-সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ করে জামায়াত-শিবির (যদি করেও থাকে) কী ফায়দা পাবে, সেটিও কিছুতেই আমার মাথায় ঢুকছে না। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘মেথড ইন দ্য ম্যাডনেস’ সে রকম কিছু খুঁজে পাচ্ছি না এখানে। তাহলে এই অযৌক্তিককে কোন যুক্তিতে ধরব?
সাম্প্রদায়িক আক্রমণ-নির্যাতনের সর্বশেষ যে ব্যাখ্যাটি আমার হাতের কাছে রয়েছে তা হলো, উপনিবেশ-উত্তর রাষ্ট্রে এক জাতি, এক ধর্ম, এক রাষ্ট্র—এ রকম রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদের চাপে এসব দুরাচার ঘটছে। এই রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদ যেহেতু আত্যন্তিকভাবে কোনো বিশেষ একটা আত্মপরিচয়কেই বড় ও চূড়ান্ত করে দেখতে চায়, সেহেতু অন্যান্য আত্মপরিচয়ের জাতি, গ্রুপ বা ব্যক্তিরা হয়ে পড়ে মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। একেই কালচারাল স্টাডিজ এবংবিধ বিদ্যায়তনিক পরিসরে বলা হয়ে থাকে ‘অপরায়ণ’।

তবে ‘অপর’ হলেই যে ‘পর’ হবে বা ‘পর’ হলেই যে ‘শত্রু’ হবে এবং ‘শত্রু’ হলেই ‘নির্যাতনের লক্ষ্য’ হবে—এ রকম কোনো অবধারিত নিয়মনীতি অপরায়ণের সূত্রে গাঁথা নেই। বাঙালি জাতীয়তাবাদ রাজনীতিতে সেক্যুলার বাঙালিত্ব তথা ‘ভাষাকে’ বড় করে তুলছে বলেই এর বিপরীতে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে রাজনীতিতে দাঁড়াতে হবে ‘ধর্মকে’ কেন্দ্র করে—এ রকম কোনো মিঠে ডায়ালেকটিক অনিবার্য নয়। এ দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করতে গিয়ে যিনি জাতিসংঘে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের প্রতিনিধিদলে অংশ নিয়েছিলেন, তিনি একসময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন। সদালাপী এই ব্যক্তিটি বাঙালি ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের পার্থক্য বোঝাতে গিয়ে ‘জল বনাম পানির’ উপমা টেনে এনেছিলেন। কিন্তু বিষয়টা এত সরল ছিল না। বাংলা ভাষায় বিভিন্ন ভাষার ও অঞ্চলের এবং ধর্মের শব্দ এত বেশি ঢুকেছে যে এই ভাষার মিশ্র চরিত্রের ভিত্তিতে বঙ্কিমের মতো সাম্প্রদায়িক চিন্তকও একপর্যায়ে বাঙালি হিন্দুর বিশুদ্ধ ইতিহাস ব্যাখ্যা লেখা অসম্ভব বলে হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। ‘ইতিহাসের উত্তরাধিকার’ প্রবন্ধে খ্যাতনামা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পার্থ চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন যে বঙ্কিম অবিমিশ্র আর্য জাতি হিসেবে বাঙালি জাতির ইতিহাস লেখার বদলে একপর্যায়ে সম্ভবত ‘বহুজাতিক বাঙালি’র ইতিহাস লেখার কথা ভেবেছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুসারে, ‘বাংলার স্বাধীন (মুসলমান) সুলতানদের আমলকেই বঙ্কিম প্রকৃত রেনেসাঁসের যুগ মনে করতেন’, ইত্যাদি। ভুল শুনলাম কি—‘বহুজাতিক বাঙালি’? যদি এটাই সত্য হয়, তাহলে একই সঙ্গে বাঙালি ও বাংলাদেশি, একই সঙ্গে বিভিন্ন ভাষাভাষী ও বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ‘বহুজাতি’ এ দেশে গড়ে উঠতে পারা যাবে না কেন? এ রকম ‘বহুজাতিক বাঙালি’তে কে সংখ্যাগুরু, কে সংখ্যালঘু—এই প্রশ্নের গুরুত্বই কমে যায়। তা ছাড়া এই ভূখণ্ডে তো বাংলা ছাড়াও অন্যান্য বহু ভাষাভাষী ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী রয়েছেই, তাদেরও তো এই বহুজাতির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমি বাঁশখালীর ধ্বংসস্তূপের ভেতরে পোড়ামাটির গন্ধ ও কালো ধুলার মধ্যে ভূলুণ্ঠিতা মাতৃসমা ওই নারীকে এসব তত্ত্ব বোঝাব কী করে? (শেষ)

বিনায়ক সেন: অর্থনীতিবিদ ও প্রাবন্ধিক।

One comment

  1. If anyone can translate this crucial text, please post your translation in the comments section, and we’ll migrate it to the main post, with credit to you as translator.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s