Remembering Garcia Marquez: Latin & Bengali novel, finding the self, or the map of the human apparition

AFP
AFP


লাতিন ও বাংলা উপন্যাস: আত্মের হদিস কিংবা উপন্যাসে আদমসুরতের নকশা

ফারুক ওয়াসিফ

যে জগতের গিঁট ছিঁড়ে গেছে, যার মন থেকে মুছে গেছে দুর্ধর্ষ সব কল্পনা, যে হারিয়ে ফেলেছে স্বপ্নজননক্ষমতা, সেই জগতে মার্কেসের মতো কথাকারেরা ফিরিয়ে আনলেন পুরাণপ্রতি কল্পনা৷ ফিরিয়ে আনলেন আদিম রিপুর দুর্মর বাসনা, বাস্তবতার কারাগার ভাংবার ডাকু ষ্ফূর্তি আর অযুক্তির কৌম উল্লাস৷ কিন্তু সময়ের বাহিরের সেইসব লাঞ্ছিত ইতিহাসের আর এগবার বা ফিরবার উপায় নেই যখন; তখন মুসা নবীর মতো হারানো মানুষকে ইতিহাসের খাতে আবার ফিরিয়ে আনবে কে? আবার চোখে কল্পনা ফিরিয়ে দেবে কে? কে জাগাবে পাপতাপের মত্যর্ের রাজত্ব? কে উপনিবেশিকতার অভিশাপে পতিত মানুষকে ফিরিয়ে দেবে তার বন্যসুন্দর আমিত্ব? সে কাহিনীকার- মিসগাইডেড অ্যাঞ্জেল, নিঃসঙ্গ ঈশ্বর- সে উপন্যাসিক৷ লুপ্ত স্মৃতির পুনর্লিখন হতে থাকে তখন উপন্যাসে৷ ধসে যায় হেগেলের সেই দম্ভ যে প্রাচ্যের মন নাই ইতিহাস নাই আমিভাব নাই৷ কত কত শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা ঘুঁচিয়ে জেগে ওঠে ইতিহাস থেকে বিতাড়িতদের গ্রাম: মাকেন্দো, ময়নার দ্বীপ, তাত্মাটুলি, চিকনডিহি, বাঁশবাদিয়া, কাতলাহারের বিল, মালো পাড়া, কুরপালা, তিস্তাপার, পাকুন্দিয়া, দক্ষিণ মৈসুন্দি৷ মার্কেস আমাদের আত্ম\’র পুণরুদ্ধারের যুদ্ধের সেই কর্নেল যিনি আমাদের কাছে চিঠি লিখে যাচ্ছেন এক আশ্চর্য সাঁটলিপিতে- শতবর্ষের নিঃসঙ্গতার অবোধ্য সেই পার্চমেন্ট পুঁথির মতো, যাতে লেখা আছে আমাদের ধ্বংসের ইতিবৃত্ত৷ অথচ সব শেষ হওয়ার আগে পর্যন্ত আমরা যার পাঠোদ্ধার করতে পারি না

এক.
“…the problems of the novel form are here the mirror-image of a world gone out of joint. This is why the ‘prose’ of life is here only a symptom, among many others, of the fact that reality no longer constitutes a favorable soil for art; that is why the central problem of the novel is the fact that art has to write off the closed and total forms which stem from a rounded totality of being — that art has nothing more to do with any world of forms that is immanently complete in itself. And this is not for artistic but for historico-philosophical reasons: ‘there is no longer any spontaneous totality of being’’
Preface to The Theory of the Novel, Georg Lukács, 1962

আধুনিক জগত থেকে ক্লেশকর এক যাত্রার শেষে, আলেহো কার্পেন্তিয়েরের লোস পাসোস পারদিদোস- দ্য লস্ট স্টেপস-(১৯৫৩) উপন্যাসের নায়ক সান্তা মনিকা ডে লা ভেনাদোসে পেঁৗছে৷ আদেলান্তাদো সেখানে জঙ্গল কেটে কয়েকটি কুড়েঘরের একটি শহর পত্তন করেছে৷ অনামা সেই নায়ক মনে করে, কিংবা মনে করতে ভালবাসে, এটাই সেই উপত্যকা যেখানে সময় থিতু হয়েছে; সময় আর এগয় না যেখানে৷ কারণ, জায়গাটি ইতিহাসের খাতের বাইরে৷ তার ধারণা এখানেই সে নিজেকে ফিরে পাবে৷ তার ইচ্ছা হয় অডেসিকে ভিত্তি করে এক সাংগীতিক সৃষ্টিকর্ম রচনা করে৷ তাই নগরপত্তনিদারের কাছে কিছু কাগজ চায় সে৷ কিন্তু আদেলান্তাদোর কাছে যেটুকু আছে, তা তো নতুন শহরের আইন লিখতেই লেগে যাবে৷ তবুও আরও একটি নোটবই তাকে দেয়া হয়৷ এবং দ্রুতই সেটিও ভরে যায়৷ বিরক্ত আদেলান্তো তাকে শেষ নোটখাতাটি দেয়৷ তখন চরিত্রটি বাধ্য হয় লেখার অক্ষর আরো ক্ষুদ্র আরো গুটিগুটি করে ফেলতে, প্রতিটি শূন্যস্থান কাজে লাগাতে৷ এমনকি নিজের জন্য একধরনের সাঁটলিপিও সে আবিষ্কার করে৷ কিন্তু তাতেও না কুলালে সে কেবলই লেখে আর মোছে৷ কেননা সামনে যাওয়ার কোনো পরিসর তার আর নাই৷ তাই লেখা, মোছা আর পুনর্লিখন প্রক্রিয়ায় তার পাণ্ডুলিপি মহাফেজখানার ‘রাখা’ ও ‘ফেলা’র (The economy of Loss and Gain) কসরত হয়ে ওঠে৷

রবার্টো গঞ্জালেস এচেভারিয়া তাঁর মিথ এন্ড আর্কাইভ অভিসন্দর্ভে দেখান, কার্পেন্তিয়েরের হাতেই হালের লাতিন আমেরিকার উপন্যাসের আদল কীভাবে দাঁড়িয়ে যায়৷ পরে, আমরা দেখব মার্কেজ, ফুয়েন্তেস, য়োসার উপন্যাসে এরকমই কিছু অসাধিত অসম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি ফিরে ফিরে আসছে৷ তা-ই যেন হয়ে ওঠে লাতিন আমেরিকার উপন্যাসের আদি আখ্যান৷
পাশাপাশি, আদি পাণ্ডুলিপির সমান্তরালে পাচ্ছি একটা যাত্রার বিবরণ- নদী, বন, পাহাড়ের ওপর দিয়ে৷ এবং আখ্যানগুলো যেন অসম্পূর্ণ৷ যেন পরের কেউ এসে তাকে এগিয়ে নেবে৷ এই মর্ত্যের রাজত্বে, পেদ্রো পারামো, শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা যেন একই আখ্যানের লিখন, লেপন ও পুনর্লিখনের সাঁটলিপি৷ ভিন্ন ভিন্ন দেশ ও কালের মধ্যে একেকটি নতুন শুরু৷ এচেভারিয়ার ভাষায় লোস পাসোস পারদিদোস হলো সেই মহাআখ্যানের মহাফেজখানা৷ এ প্রক্রিয়ায় যা ঘটছে, এচেভারিয়া বলছেন,

If Carpentier’s novel is the founding archival fiction, Garcia Marquez’ is the architypical one.

পাওয়া ও হারানো, আত্ম-আবিষ্কারের সফর, নতুন আরম্ভের মিথ আর সেই আদি অভিজ্ঞতানিচয় মিলে গঠন করে লাতিন আমেরিকার উপন্যাসের মণিমুকুর বা পড়ত্ব৷ কার্লোস ফুয়েন্তেসের তেরা নোস্ত্রা (১৯৭৬), কার্পেন্তিয়েরের এল রেইনো দে এস্তে মুন্ডো বা এল সিগো ডে লা লুসে, য়োসা’র লা গুয়েরা দেল ফিন দেল মুন্ডোসহ ইত্যাকার উপন্যাসগুলো যেন লাতিন আমেরিকার নিজস্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতি কাঠমো খুঁজে ফেরা৷ এবং অবশ্যই জীবনের নিজস্ব সংবেদ খুঁজে পাওয়ার প্রয়াস৷ লেখা হয়ে ওঠে বর্তমানে যাপিত স্মৃতি (অ্যাক্টিভ মেমোরি)৷ যেন ধস নামে হেগেলের সেই দম্ভে, যে প্রাচ্যের ইতিহাস নাই আত্মচেতন নাই; তারা বিশ্বেতিহাসের অংশ বা উপাদান মাত্র৷ এই নতুন ‘আামি’র সার্বভৌম আবির্ভাব, নিজস্ব ‘ছিল’র সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানতাত্তি্বক প্রত্নতত্ত্ব খুঁড়ে বের করার মিশন যেন উপন্যাসেরও হয়ে ওঠার মিশন৷ গ্রিসে যেমন ইতিহাস ও দর্শন একাকার হয়ে গিয়েছিল মিলনে-সংঘাতে, লাতিন জগতে আইন ও আখ্যান তেমনই এক দোসর৷ তাই,

Latin American novel must appear to be obsessed with Latin American history and myth.
(Myth and Archive: Echevaria)

এভাবে মিথ ও ইতিহাস উপন্যাসে সহাবস্থান করে একটি ভূখণ্ডের মানবসমাবেশকে আখ্যানের মধ্যে ষ্ফুট করে তোলে৷ যেজন্য তৈরি বাস্তব ও তার বন্ধনের যুক্তিকে অস্বীকার করতে হলে ফিরতে হয় সেই ইতিহাসের ‘অরিজিনালিটিতে’; পর্দায় ঢাকা মিথ ও লোকস্মৃতিকে সক্রিয় করে তোলার মাধ্যমে৷ তার জন্য দরবারি ইতিহাসের এক ধাপ পেছনে গিয়ে যেমন লুপ্ত সমাজ, চেতনের অন্তর্যুক্তিকে ধরতে হয় তেমনি মিথ ও প্রাকৃতিক অস্তিত্বসমূহকে শৈল্পিক অস্তিত্ব করে তোলার দরকার হয়৷ আর সেই অস্তিত্বের শীর্ষে থাকে সামাজিক গতিশীলতা এবং ঐতিহাসিক ও প্রজাতিগত স্মৃতি৷
ইতিহাসতত্ত্বের প্রাথমিক উপাদান লাতিন ইতিহাসে তাই ‘আর্কাই’৷ আখ্যায়ন বা ‘কথা’ হলো সেই প্রাথমিক উপাদান, যা থেকে সৃজিত হবে ইতিহাস ও উপন্যাস উভয়েরই কল্পনা৷ ইতিহাস কাকে বলছি? ‘ইতি’ মানে পূর্বের৷ আর ‘হা’ অব্যয়, যার পরিবর্তন আর সম্ভব না এবং ‘অসিত’-ছিল৷ আর ছিল আইনের ভাষ্য৷ আমাদের মনে আছে যে, আইন ও আখ্যানের টানাটানি একই পরিসরের অধিকার নিয়ে, সেই পরিসর হলো সমাজ ও মানুষের জীবন৷ ফুয়েন্তেসের ভাষায়,

The Roman legalistic tradition is one of the strongest components in Latin American culture: from Cortes to Zapata, we only believe in what is written down and codified.
_ Carlos Fuentes/Newyork Book of review, 1986

কিন্তু এ কি সাহিত্যের প্রকৃতির বাইরে চলে যাওয়া নয়? এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা আসবে শেষে৷ লেখ্য জ্ঞান (আইন, দলিল, ভ্রমণবর্ণনা, নৃতত্ত্ব, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান) আর লোকস্মৃতি, কল্পনা ও মিথের বিন্যাস ছাড়া লাতিন উপন্যাসকে বোঝা ও ব্যাখ্যা করা কতটা সম্ভব? তা যদি হয়, তাহলে উপন্যাস বুর্জোয়া সমাজের ফল বা তার আবির্ভাব মহাকাব্য থেকে (গিওর্গ লুকাচ: দা থিওরি অফ দা নভেল), তা সর্বভাষার অভিজ্ঞতার সাক্ষ্যে বলবার উপায় নাই৷ তা থাকতেও পারে নাও পারে৷
অ্যাডর্নো ও বাখতিন উপন্যাসের ঐতিহ্য অনুসরণ করেন প্রাচীন গ্রিসের নন সেকুলার টাইম ও স্পেসে৷ এ কথা দেবেশ রায়ও জোরের সঙ্গে তুলেছেন৷ তাহলে, উপন্যাস এখানে জ্ঞানতাত্তি্বক পদ ও প্রকরণ হয়ে ওঠার দাবি করে, যার ঐতিহ্য আধুনিক যুগেরও আগে থেকে বহমান৷ এচেভারিয়ার প্রস্তাব,

The novel having no fixed form of its own, often assumes that of a given kind of document endowed with truth bearing power by society at specific moments in time.

আমার জোর এখানে উপন্যাস বা ন্যারাটিভের এই ঃত্ঁঃয নবধত্রহম ঢ়ড়বিত্-এর ওপর৷ এটাই তাকে সাহিত্যের বলয়ে অ-সাহিত্যের গুণসম্পন্ন করে তোলে৷ অন্তত প্রচলিত নন্দনতত্ত্বেও সত্য ও কল্পনা যেখানে বৈরি, যেখানে সৌন্দর্য আর জ্ঞান দুই বিপরীত আকাশের সূর্য হয়ে জ্বলে৷ কিন্তু এই সত্যবহ-ক্ষমতা ছাড়া শিল্প হিসেবে উপন্যাস
স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠতে পারে কি? বলা দরকার, এই সত্য ইতিহাস ও দর্শনের সত্য নয়, মানবীয় অভিজ্ঞতা এবং কল্পনার আধারকে অবলম্বন করে তা আসলে ইতিহাস ও দর্শনের কাঁধে ভর করে দাঁড়িয়ে তাদের ছাপিয়ে যায়৷ উপন্যাস বা শিল্পের এই ট্রুথ বিয়ারিং পাওয়ার জ্ঞানতাত্তি্বক অবদান নয়, জ্ঞানের সীমাকে পেরিয়ে যাওয়ার বাসনা নিয়ে তা জন্মায়৷
সে কারণে, উপন্যাস প্রায়শই একটি সংস্কৃতির ইতিহাস ও দর্শনের সমান্তরাল হয়ে ওঠে৷ যেমন রুশ বা ফরাসি উপন্যাস, এমনকি বাংলা উপন্যাসও৷ ইতিহাসের সমর্থন, ভাষার কাঠামোয় ধৃত চিন্তার অবলম্বন ছাড়াই যে কারণে কোনো বিশেষ ভাষার বিশেষ উপন্যাস-মণ্ডলকে নিজস্ব বৈশিষ্ঠ্য সমেত সনাক্ত করা সম্ভব৷ বাখতিন যেমনটা করেছেন ইউরোপীয় উপন্যাসের বেলায়৷ বাংলা ভাষার বেলায় এই কাজ এখনো অসাধিত রয়ে গেছে৷

দুই.
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে পজেটিভিজমের (দৃষ্টবাদ) ধার ক্ষয়ে এলে নতুন নৃতাত্তি্বক ও দার্শনিক চিন্তার বিকাশ ঘটে৷ ইউরোপের দেখানো পথের বাইরেও স্বতন্ত্র গন্তব্য সম্ভব এমন প্রতীতি জন্মে৷ দু দুটি বিশ্বযুদ্ধ, মনবতার বিপুল ক্ষয় ও ক্ষতি, মানুষের ভেতরকার পাশবিকতার অলঙ্ঘনীয় আধিপত্য এনলাইটেনমেন্টের অনেক বিশ্বাস ও ধারণাকে নড়িয়ে দেয়৷ তখনই চোখ পড়ে অঞ্চল ও তার সমাজের ‘অযৌক্তিক’ উপাদানের দিকে৷ উপন্যাসের ইউরোপীয় আদিপিতারা: বালজাক, গান্ডোস, ডিকেন্স, জোলারা যে অর্থে তাঁদের সময়ের সমাজতাত্তি্বক ও তত্ত্ববিদ, সেই অর্থের শাসন পরিহার শুরু হয়৷ শিল্পের উপায় হিসেবে বাস্তবতাবাদের একচ্ছত্র প্রাধান্য কমজোরি হতে থাকে৷ আজ যাকে ম্যাজিক রিয়েলিজম বলা হচ্ছে, তা আসলে সেই ঊনিশ শতকীয় রিয়েলিজম ও ন্যাচারালিজমের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা৷

ইউরোপে যখন এভাবে যখন মোড় ফেরা হচ্ছে, ইউরোপের যা অপর, সেই উপনিবেশিত দেশগুলোর বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের মধ্যেও উপনিবেশিকতা বিরোধিতার সূত্র ধরে এবং নব্যপ্রাপ্ত স্বাধীনতার আত্মবিশ্বাসে ইউরোপীয় আধুনিকতার গড়নে আত্মনির্মাণের অসম্পূর্ণ প্রকল্পে আস্থা নড়ে যায়৷ খোঁজা শুরু হয় নিজস্ব অস্তিত্বের অবশিষ্ঠ উপকরণগুলো, যা তখনো শতবর্ষের নিঃসঙ্গতায়, উপনিবেশিক অধীনতায় বিলোপ পায়নি৷ উপন্যাসে বিউপনিবেশীকৃত এক ‘আমি’র আবির্ভাব সূচিত করে এই ঘটনা৷

এই ‘আমি’ স্প্যানিশ উপনিবেশায়নের আগে ছিল কি না, সে তর্ক রেখে দিয়েও বলা যায়, জাতীয় চৈতন্য সন্ধান ও নির্মাণের জন্য লাতিন লেখকদের ভেবে নিতে হয়েছিল, সেই আমি ‘আছে’ এবং তা সম্ভব৷ এবং তা টের পাওয়া যায় উপনিবেশায়িত ‘আমি’ যে প্রজা তার অস্তিত্বের দ্বান্দ্বিকতার মধ্যে৷ একদিকে সে তার অধীনস্ততা সম্পর্কে সচেতন আবার সে কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতারই অংশ৷ হেগেল যেমন তাঁর গধংঃবত্-ঝষধাব উরধষবপঃরপং-এ বলেন,

Firstly through suspension it gets back itself…for it was aware of being in the other, it cancels its own being in the other…

লাতিন উপন্যাস প্রমাণ করে ইউরোপীয় চোখে বর্ণিত সেখানকার মানুষ ও প্রকৃতি, ভাষা ও প্রাণপুঞ্জ বস্তনিচয় নয় কেবল, তা সজাগ ও বিকাশশীল সত্ত্বা৷ সেই সত্ত্বার সন্ধানই হলো লাতিন উপন্যাসের ভিন্ন গন্তব্য৷ অনেকটা সভ্যতা আবিষ্কারের প্রত্নতাত্তি্বক অভিযানের মতো রোমাঞ্চকর এই উদ্ভাসন৷ এই প্রক্রিয়ায় আবারো দেখা পাই, লস এন্ড গেইন অব মেমরি’র৷ অতীতকে পুনর্বাখ্যা ও পুনসৃজন করা৷ কেননা, অতীতের আখ্যানপুঞ্জ থেকেই ছন্নছাড়া আত্মপরিচয় জোড়া লাগাতে হয়৷ সংস্কৃতির ভেতর এই পরিচয়কে খুঁজে নিতে তাই দেখি, অনেকগুলো পরস্পর জোড়লাগা আরম্ভ৷ বাস্তবতার প্রত্যক্ষতাকে, সাক্ষাত্ অভিজ্ঞতার সীমা-শাসনকে মোকাবেলা করে তার দাসত্ব থেকে বেরিয়ে আসার গতিসূত্র৷ কেননা, বস্তুগততা, সমাজতত্ত্ব ইত্যাদির ভার উপন্যাসের কল্পনাকে এতকাল সীমিতই করে রেখেছিল এমন উপলব্ধির উন্মেষের মধ্যেই জাতীয় আখ্যান ও জাতীয় উপন্যাসের আভাস তৈরি হয়৷

তিন.
বাংলা উপন্যাসের বেলাতেও এরকম ভিন্ন ভিন্ন সজ্জা বা ডিজাইন দেখতে পাওয়া যায়৷ আমি এখানে মোটাদাগে দু’টি ধারার কথা বলবো৷ প্রথমে আসবে রবীন্দ্রনাথের গোরা ও ঘরে বাইরের সমাজজিজ্ঞাসা এবং শরত্চন্দ্রের ও শ্রীকান্তের আত্মজিজ্ঞাসা (দেবেশ রায়, সাক্ষাত্কার, অপর পত্রিকা)৷ যা গড়ন-গঠনে আধুনিক, সেকুলার এবং অবশ্যই জাতীয়৷ সেই জাতীয় আত্মজিজ্ঞাসা অবশ্যই উচ্চবর্গীয় ভারতীয় জাতীয়তাবাদের অঙ্গনে উপ্ত৷ অন্য ধারায় আনা যায় মানিক বন্দোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি, তারাশঙ্করের হাঁসুলি বাঁকের উপকথা, সতীনাথ ভাদুরির ঢোঁড়াই চরিত মানস, অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম, রমেশচন্দ্র সেনের কুরপালা, অমিয়ভূষণ মজুমদারের গড় শ্রীখণ্ড, দেবেশ রায়ের তিস্তাপারের বৃত্তান্ত আর আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা উপন্যাসকে৷ নিম্নবর্গীয় জীবন ও সেই জীবনের নিজস্ব চৈতন্যকে ধরতে গিয়ে এই ধারার উপন্যাসগগুলো আধুনিকতার চৌহদ্দির বাইরে গিয়ে, উচ্চবর্গীয় জাতীয় জাগরণের সঙ্গে দ্বান্দ্বিক এক সম্পর্ক গড়ে তোলে৷ প্রবাহ আসলে দুটো নয়, তিনটি৷ একটি বঙ্কিমি মডেলের ইউরোপীয় আদলের উপনিবেশিক আখ্যান, অন্যটি এর সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে জাতীয় বুজের্ায়ার আত্মানুসন্ধান, সে সন্ধান আবার তার মর্মে তখনো উপনিবেশিকতা-বাহিত র্যাশনালিজম ও এনলাটেনিমেন্টের চেতনাকে, পশ্চিম ইউরোপের আগ্রাসী প্রগতিকে মর্মে ধারণ করে আছে৷ তৃতীয় ধারাটি এ দুটোরই সংকট থেকে জাত, অনেকটা লাতিন উপন্যাসের মতো ‘দেশে ফেরা’র প্রয়োজনে৷ প্রথম দুটি ধারা তবুও এক বৃত্তেই অবস্থান করে এবং সাহিত্যের ইতিহাসে তাদের আম্মীয়তার যোগাযোগ দেখা যায়৷ ফলে আসলে শেষ পর্যন্ত পাওয়া যায় দুটি ধারা৷ উপনিবেশিকতার আঘাতে ও আধারে এই দুই জাগরণ একমুখী ছিল না৷ গৌতম ভদ্রের ভাষায় বললে, চুলের বেনীর মতো তারা পরস্পরকে বেষ্টন করেও আলাদা৷ (সাক্ষাত্তার, নতুন পাঠ, ফারুক ওয়াসিফ)

ওপরে যে দুটি ধারার কথা বলা হলো, তার প্রথমটি যদি রিয়েলিজম হয় দ্বিতীয় ধারাটি নন-রিয়েলের জগতে প্রবেশ করে৷ প্রথমটা যদি সেকুলার ভাববিশ্বে বিরাজ করে দ্বিতীয়টি অ-সেকুলার আবহে গড়া৷ প্রথমটা যদি নাগরিক-জাতীয় হয়, দ্বিতীয় ধারা অনাগরিক ও আঞ্চলিক ও নিম্নবর্গীয় চৈতন্যকে ধরবার চেষ্টা- অধিপতি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে এবং এ দুইয়ের সংঘাত ও মিলনের টেনশনে৷

দ্বিতীয় ধারাও সমসত্ব ছিল না৷ এখানেও (বুঝবার সুবিধার্থে) তিন ধারায় দেখা যায়: ক. হাঁসুলি, ঢোঁড়াই, কুরপালা স্থানবোধ ও নিম্নবর্গীয় বোধকে আনে বটে কিন্তু শেষমেষ গান্ধীর জাতীয়তাবাদী আবহকেই বক্ষে ধারণ করে৷ খ. পদ্মা, তিতাস ও খোয়াবনামা নিম্নবর্গীয় চৈতন্যের আধারে, তার মিথ ও কথালেখ্যর মধ্যে দিয়ে বহমান জাতীয় চৈতন্যের দিশা দাঁড় করায়৷ গ. গড় শ্রীখণ্ড ও তিস্তা অন্যগুলোর থেকে অভিনব এই অর্থে যে, তা প্রথম দুটি ধারার দ্বান্দ্বিকতারই বিকাশ হিসেবে আসে৷ এভাবে ভেতর ও বাইরের নানান যোগাযোগে ইতিহাস সক্রিয় হয়ে ওঠার পর্বগুলো দিয়ে দেশের দিকচিহ্ন আবিষ্কারের চেষ্টা হয়েছে৷ সেই চেষ্টা এখনো চলছে৷ এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, জাতীয় ইতিহাসের সমান্তরালে সাহিত্য তথা উপন্যাসেরও কি এক সমান্তরাল ইতিহাস-কাঠামো থাকা সম্ভব?

তিস্তা পারের বৃত্তান্ত একদিক থেকে অনন্য৷ আধুনিক চেতনায় প্রায় অবোধ্য মন ও সত্তাকে ধরার চেষ্টা করা হয়, সেই কাজে বাঘারুর জগতের চারপাশে গড়ে ওঠা যে মিথ, দলিল, সাকর্ুলার, ভূমি গেজেট, ডায়ালেক্ট আসে, তা যেন উপন্যাস নামক ফর্মটির আত্মসচেতনভাবে তার বিষয়ের সঙ্গে লীলা করার পরীক্ষা৷ এখানে আর্কাইভে ধরা জ্ঞানের প্রত্নতত্ত্ব এবং প্রিমডার্ন মন ও জগতের আবহের সমবায় দেখা যায়৷ উপন্যাস যতটা আধুনিক ফর্ম, বাঘারুর জগত ও তার আধা-প্রাকৃতিক মন ততটাই প্রাগাধুনিক৷ সেই সেই জগতের মানুষ, যে জগতে লুকাচ কথিত Spontaneous totality of being ছিল৷ যখন জগত ও তার মধ্যে বসবাসকারী মন-এর মধ্যে ভেদ ছিল না৷ যখন সবকিছুই একধর্মী, যেখানে চেতন আর অভিজ্ঞতার মধ্যে দ্বন্দ্ব চেতনার ফাটল হিসেবে আবিভর্ূত হয়নি৷ মানুষ যখন প্রকৃতির মধ্যে হারিয়ে ছিল, আত্মহারা ছিল৷ সেই জগতে মিথ গড়ে ওঠে, মহাকাব্যের বীরেরা এমন জগতে বিচরণ করে৷ কিন্তু উপন্যাসের মতো এক বিমূর্ত প্রবাহের অাঁকশি দিয়ে আধুনিকতার অপর যে বাঘারু, তার ঘনবিমূর্ত অবোধ্য মনকে, তার অ্যাকশনের সঙ্গতি-অসঙ্গতিকে, কিংবা তার জীবনের অর্থকেই বা কীভাবে আয়ত্ত্ব করা সম্ভব? উপন্যাস ও তার বিষয়ের এই আগম-নিগমহীন দ্বিবিধতার এই টেনশনের সীমান্তেই, সেই আদিম শালবন, পাহাড় থেকে নেমে আসা তিস্তার বন্যতা আর আধুনিক সমাজশক্তি ও তার পেছনে হানা দিয়ে আসা রাষ্ট্রের সীমান্তের অভিজ্ঞতা নিয়েই তিস্তাপারের বৃত্তান্ত এক বিরাট উপন্যাসিক উচ্চাভিলাষের নজির হয়ে থাকে৷

অন্যদিকে খোয়াবনামা অদ্বুত মায়াবি জাতীয় আখ্যান হয়ে ওঠে৷ তা মিথ-পুরান ও লোকস্মৃতিরই যেন সম্প্রসারণ৷ মিথ ও ইতিহাসের প্রাণভোমরা হয়ে নিজস্ব ইতিহাসকাঠামোর (হিস্টরিওগ্রাফি) মধ্যে জনগোষ্ঠীর ভাবকাঠামো (স্ট্রাকচার অব ফিলিং) সন্ধান ও পুননির্মাণ করে৷ এই ইতিহাস একমাত্রিক নয়, ভূত থেকে ভবিষ্যতযাত্রী নয়৷ মানুষ-প্রকৃতি, দৃশ্য ও অদৃশ্য, হাজির ও গায়েবি, আধুনিক ও প্রাগাধুনিক, রাষ্ট্র ও সমাজ, উপনিবেশিকতা ও তার বিরোধী সত্তা; এরকম অজস্র বিপরীতের মিলন ও সংঘাতের মানবীয় অভিব্যক্তি ধারণ করে খোয়াবনামা৷ বঙ্কিমের রোমান্টিক মন ইতিহাস ভুঁইফোঁড় কল্পনাকে উপন্যাসে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, যেমনটা চেয়েছিলেন ইতিহাস ও সংস্কৃতিতেও৷ খেয়াবনামাও অন্য কল্পনা ঠাঁই পায়৷ ঊনিশ শতকীয় বেঙ্গল রেঁনেসাসের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়৷ মহা-ইতিহাস, মহাপুরাণ, মহাধর্ম ও মহামিথ ও মহাপ্রগতির আখ্যানের বিপরীতে আমরা পাই ছোটো ইতিহাস, লোকপুরাণ, লোকধর্ম, লোককিংবদন্তী ও লোকায়ত মুক্তি আকাঙ্খার স্পন্দন৷ খোয়াবনামা নিজেই সেই জগতকে প্রতিষ্ঠিত করে, তার উপস্থিতির সাক্ষ্য দেয়, উপনিবেশিক মন ও কলকাতাই জাতীয়তাবাদ যাকে উপেক্ষা করেছিল, যাকে বদলাতে চেয়েছিল৷ পশ্চিমের বিরুদ্ধে পূর্বের অস্তিত্বমানতার সাক্ষি খোয়াবনামা৷

বাঘারু ও তমিজের বাপেরা, কিংবা তিস্তাপারের দুর্গমতা, অবোধ্য বাস্তবতা আর যমুনা পারের লৌকিক-অলৌকিক অস্তিত্ব, তমিজের বাপের স্বপ্ন, মুনশি বায়তুল্লাহ-র কিংবদন্তী, কাত্লাহারের বিলপারের মাঝি-পাড়া, মালো পাড়া, কলু পাড়া, কামার পাড়ার জগতকে কীভাবে আধুনিক যুক্তিশীল ভাবকাঠামোয় ধারণ করা সম্ভব? এজন্যই এগুলোকে উপন্যাসের বিষয় করা নিজেই এক বিপ্লবী ঘটনা৷ এমন ইতিহাস আগে লেখা হয়নি৷ আবারো সেই কথাটি আসে৷ ইতিহাস-দর্শন-সমাজতত্ত্ব তাদের অ-সভ্য আদিম বা কৌম মনকে এখনো ধরে উঠতে পেরেছে বলা যায় না, তাহলে উপন্যাস কীভাবে তাদের চেতনকে-তার অনুভবকাঠামোকে, তার জগতদিশাকে ধরবে? উপন্যাস তার গঠন ও বিকাশের শর্তে ব্যক্তিকেন্দ্রিক আধুনিক ফর্ম৷ এই ফর্ম কীভাবে যারা এখনো আধা-প্রকৃতি- মার্কসের বলা স্পেসিস বিয়িং-যার আত্মসচেতনা অর্ধচেতন, যে এখনো সোস্যাল বিয়িং নয় পুরোপুরি, তাকে ধারণ করা উপন্যাসের পক্ষে কঠিন৷ এর জন্য উপন্যাসকে নিজেকেও বদলাতে হয়৷ খোয়াবনামা ও তিস্তা পারের বৃত্তান্ত একারণে উপন্যাসের নতুন ধরন নির্মাণ করে৷ অর্থাত্ তার বি-উপনিবেশিকরণের পথে পা ফেলে৷

আরো বিশেষ করে ফেললে, দেবেশ রায়ের কথা ধার করে, প্রথম যুগের আত্মবোধ, দ্বিতীয় যুগে দেশবোধ এবং তৃতীয় পর্বে আমরা পাই ইতিহাসবোধ৷ এবং বিশিষ্টভাবে তা কেন্দ্রের বিপরীতে প্রান্তের ইতিহাসবোধের কথা বলে, কিংবা বলা যায় তাদের জীবনবোধের কথা৷ এর মাধ্যমেই ঘটে কেন্দ্রবিধ্বংসী ন্যারেটিভের হেজিমনিক আবির্ভাব৷ এবং এই ন্যারেটিভ সরলরৈখিক নয়৷ উপন্যাসের এই আখ্যানকে অতীত থেকে বর্তমান এবং বর্তমান থেকে অতীতের এই যাত্রা আপাতভাবে মনে হলেও, তা আসলে বর্তমানের কাঁচের দেয়ালে ধাক্বা খেয়ে আবার অতীতমুখে ফিরে যাওয়া নয়৷ কেননা, অতীত নামে কোনো স্টেশন নেই, যেখানে উল্টোপথে সময়ের ট্রেন কোনোদিন গিয়ে পেঁৗছাতে পারে৷ আসলে তা নতুন ভবিষ্যত সৃজনের জন্যই, এ আমির খোলস ভেঙ্গে অন্য আমি’র জন্মদাগ গুলো চিনিয়ে দেওয়ারই চেষ্টা৷ এটাই উপন্যাসের সেই ট্রুথ বিয়ারিং পাওয়ার, এটাই বিদ্যমান জ্ঞানতত্ত্বের সীমানা ডিঙ্গানো লাফ৷
উপন্যাস শেষপর্যন্ত একটা প্রবাহ৷ বর্তমানের সীমাটি দৃশ্যত না ভাংতে পারাটাই ওই বাস্তবতার দাসত্ব৷ উপন্যাসিক স্মৃতি বা এর প্রবাহ বর্তমান পেরিয়ে যেতে পারে, হতে পারে ভবিষ্যতেরও স্মৃতি৷ এভাবে অতীত নির্মাণের মাধ্যমে তা আসলে ভবিষ্যতের জন্য একটা ছাঁচ বানিয়ে রাখে৷
চার.
উপন্যাস এভাবে অজানা থেকে জানায় এবং জানা থেকে অজানায় প্রবেশ করে৷ হাসুলি, ঢোঁড়াই যুগের যে রূপান্তরপর্ব, রেল ও আধুনিকতার আগমনের প্রতিক্রিয়া সেটাও কিন্তু বহিরাগত অজানাকে বুঝে দেখার প্রতিক্রিয়া৷ আর এটা হলো অন্তর্গত অজানাকে আবিষ্কারের সক্রিয়তা৷ এই রূপান্তরের চিহ্নগুলোও যদি দাগিয়ে রাখি তো দেখা যায়, মানিকের ময়নার দ্বীপ, গাওদিয়া; তারাশঙ্করের বাঁশবাদিয়া; অদ্বৈতের তিতাসের মালোপাড়া, ঢোঁড়াইচরিতমানসের গ্রাম, রমেশচন্দ্রের কুরপালা, অমিয়ভূষণের চিকনডিহি, দেবেশের তিস্তাপার-শালবন, ইলিয়াসের কাত্লাহারের বিল সবই রূপান্তর এবং গেইন এন্ড লসের পটভূমি৷ ইতিহাসের বিলয় ও আরেক ইতিহাসের শুরুর সন্ধিক্ষণের অনুভব৷

এই বিলয় ও উদয়ের গতিসূত্র দেখি খোয়াবনামা হারিয়ে যাওয়া ও তমিজের মধ্যে আবার তেভাগার স্বপ্ন আকারে উদয় হওয়া, পুলিশের গুলিতে হাড্ডি খিজিরের মরে যাওয়া এবং ইলেকট্রিকের তারে তারে ছুটে ওসমানকে পথ দেখানোর মাধ্যমে আবার ফিরে আসায়৷ অমিয়ভূষণ মজুমদারের গড়শ্রীখণ্ডে দেখবো যে সব শেষ হয়ে গেল, সব ভেসে গেল৷ বানের তোড়ের মধ্যে শুধু দুই শান্দার গোত্রের তরুণ তরুণী ইয়াজ আর সুরতুন গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে নতুন জাগা ভূখণ্ডে৷ তারা শেষের শুরুর দুই নারী-পুরুষ যেন তারা৷ নতুন এক জেনেসিসের আদম ও হাওয়া৷ সেই নতুন চরটা হচ্ছে পূর্বদিকে৷ অর্থাত্ নতুন ইতিহাস শুরুর ইঙ্গিত পাচ্ছি, একটা ময়না দ্বীপে ও আর এ নতুন চরে৷ (এই নতুন জাগা চরকে কি নতুন বাংলাদেশ বলা যায়, যার জন্মের প্রসব বেদনায় ইতিহাস তখনই মন্থিত হচ্ছে?) এই কাহিনীগুলো ২০/৩০ এর দশকের পূর্ব বাংলার কাহিনীও বটে৷ গ্রাম সমাজের ভাঙ্গন, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং নতুন সামাজিক ও উত্পাদন সম্পর্কের আবির্ভাব এর বিষয়৷ যেখানে রেললাইন হচ্ছে, কলকারখানা হচ্ছে, ব্যবসায়িরা আসছে৷ এসবের সমান্তরালে চলছে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন৷ এই ভাবে ধরে ধরে যেটি দেখবো যে ওই ভাঙ্গাগড়া বা একই কাহিনী নিয়ে প্রায় প্রত্যেকে আবিভর্ূত হয়েছেন৷ কিন্তু প্রত্যেকে কাহিনীকে নিজেদের মতো করে তাত্পর্য দেবার চেষ্টা করেছেন এবং নিজস্ব সিদ্ধান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন৷ আর এর মধ্যে আবির্ভূত হচ্ছে সেই ফলিং ফিগার, মালোপাড়ার মাঝি সম্প্রদায়, ঢোঁড়াই, চিকনডিহির জমিদারি, কুরপালার গান্ধি, হাঁসুলিবাঁকের বনওয়ারি ও খোয়াবনামার তমিজের বাপ৷ অন্যদিকে উঠে দাঁড়ায় (রাইজিং ফিগার) করালি, বাঘারু ও তমিজ ও হাড্ডি খিজিরেরা৷
এখানে দেবেশ রায় বলবেন, শিল্পের ল অব বিউটির ওপর ল অব হিস্টরি আরোপ করা হচ্ছে৷ তিনিই আবার বলছেন, ঔপন্যাসিকের কাজ হিস্টরিসাইজেশন, ব্যক্তির হিস্টরিসাইজেশন৷ আগ বাড়িয়ে বলি, সমাজ বা চৈতন্যের হিস্টরিসাইজেশন নয় কেন? ল অব বিউটি সার্বভৌম হতে পারে, স্বয়ম্ভু তো নয়!

উপন্যাাসের শিল্পধ্যান, বিষয়জ্ঞান ও বিষয়ধ্যান আসলে কী? উপন্যাস তো নিছক শিল্প নয় মহাকাব্যের মতো, কেবল বিউটি বা লিটারেচার নয়৷ আমরা আগে দেখিয়েছি উপন্যাসিক চৈতন্য আসে সাহিত্যের কাঠামোর বাইরে থেকে৷ উপন্যাস যে বাস্তবতা ও চেতনার অন্তরালের মবিলিটি বা স্পৃহার সঞ্চালন ধারণ করে, তা সাহিত্য কী? তা স্বাধীন, স্বতন্ত্র বলেই ইতিহাস ও দর্শনের সহায় নিয়েও তাদেরই সমকক্ষ হওয়ার দাবিদার৷ দাবিটা জ্ঞানতাত্তি্বক৷ বাস্তবতা এখানে ফর্ম নয়৷ তা লেখকের মধ্যে দিয়ে নিজেও প্রতিষ্ঠিত হয়৷ লেখক অ্যাবসলিউট প্রডিউসার নন৷ উপন্যাস ইতিহাসের ভেতর অ-ইতিহাসের কায়দায় প্রবেশ করে বলেই তা ইতিহাসের নিয়মের অধীন নয়৷ কাজটা এখানে শিল্প ও ইতিহাসকে ফ্রেম আকারে ব্যবহার করে তার উল্টা কথা বের করে আনা৷ বলা যায় সাবজেক্টিফাইং দা অবজেক্ট৷
উপন্যাস আমাদের উপনিবেশায়িত চেতনার দ্বন্দ্ব থেকে সৃষ্টি হওয়া মাধ্যম৷ আর উপনিবেশায়িত হওয়া হলো ভাষার ও চেতনার কৈশোরকাল হারিয়ে ফেলা, যা অপর কেউ কেড়ে নিয়েছিল৷ কৈশোর হলো সেই সময় যখন একদিকে ব্যক্তিত্ব বিকশিত হয় এবং স্বভাব-চরিত্র দাঁড়িয়ে যায়৷ সেই সময়টা আমাদের থেকে কেড়ে নেওয়া হলো, আমাদের নিজেদের মতো করে বেড়ে উঠতে দেওয়া হলো না৷ ইংরাজশক্তি ভাষার শক্তিকে দুর্বল করতে আমাদের গদ্যশক্তির ওপর দখল নিল৷ মোদ্দা কথা এই যে, উপনিবেশবাদ হলো অধীনস্ত সংস্কৃতির নিজস্ব বিকাশ রহিত করার রাজনীতি৷ আমাদের উপন্যাসে সেই হারানো কৈশোরিক সংযোগটা ফিরে পাওয়ার যাত্রা বাংলা উপন্যাসের আখ্যানপুঞ্জ হিসেবে এখন বোধকরি দেখতে পাওয়া সম্ভব৷

উপনিবেশিকতা আরেক অর্থে আসলে ভাষা-সংস্কৃতিকে সেকু্যলার করার প্রকল্প৷ সংস্কৃতি ও ইতিহাস এবং অবশ্যই ভাষা একটি জনগোষ্ঠীর লৌকিক-অলৌকিক অভিজ্ঞতা, বিশ্বাস-সংস্কার-অবিশ্বাস, ভালবাসা ও ঘৃণা, মাটি-বায়ু-পানির রং-রস-গন্ধ, ধর্ম ও ভাব সবই ধারণ করবে৷ ভাষা নিজে বিমূর্ত, কিন্তু নিজের বিমূর্তায়ন কী? চেতনা ও বস্তুনিচয়ের চিহ্ন ভাষায় বিমূর্ত প্রতীক হয়ে আসে৷ জন্মের এই দাগ, জগতের এই ঘ্রাণ ভাষা ও আখ্যান থেকে, গদ্য ও কাহিনী থেকে সরিয়ে নিলে থাকে কী? থাকে কেবল এক নিরাকার আমি, যে আমি থেকে আখের মতো মাড়াই করে তার নিজস্বতার, তার ভূগোলের আর তার ইতিহাসের রসগুলো শুষে নেওয়া হয়েছে৷ এই মানুষ পরাধীন, উপনিবেশিকতার সন্তান৷ একে প্রতিস্থাপন করা খুবই সম্ভব৷ কিন্তু এক জনগোষ্ঠী, ইতিহাস ও ভুগোলকে এভাবে মাড়াই করা যায় না, তাকে অন্য জনগোষ্ঠী ইতিহাস ও ভূগোল তথা অন্য সংস্কৃতি দিয়ে প্রতিস্থাপন করা অসম্ভব৷ ভাষায়, আলেখ্যে, আখ্যানে তাই দাগ থাকবে৷ তাকে নিদাগ, বিমূর্ত চেতনার সেকু্যলার করা তাই সম্ভব না৷

এখানে বাংলা উপন্যাসের দুটি ধারায় দুই রকম ফলের কথা বলে শেষ করবো৷ তিস্তা বা গড়শ্রীখণ্ডে সমাজতত্ত্ব যত আসে, জনগগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক যাত্রার সংবাদ তত আসে না৷ রাষ্ট্র সেখানে বিমূর্ত ক্ষমতা হিসেবে থাকে, অঞ্চলের ও ডায়ালেক্টের ব্যাপ্তিতে জাতীয় চৈতন্যের প্রগাঢ় অবয়ব কিংবা জনগোষ্ঠীর স্পন্দমান অস্তিত্ব হিসেবে ততটা আসে কি? যে জাতবোধ, দেশবোধ ও আত্মবোধ এবং বিশ্ববোধ সেখানে নির্মীয়মান তার পশ্চাতভূমি ভারতরাষ্ট্র এবং বৃহত্তর ভারতীয় সনাতন সমাজকাঠামো৷ বাংলাদেশের উপন্যাসে ওয়ালীউল্লাহ থেকে ইলিয়াস ও শহিদুল জহীর হয়ে সেটা কিছুটা আকার পায় বলে দেখা যায়, এর প্রেক্ষিত নতুনভাবে সংগঠিত হওয়া বাংলাদেশি সমাজ, প্রকৃতি ও তার নতুন রাষ্ট্রপরিসরের মধ্যে ব্যক্তি ও ব্যক্তিসমূহের কাহিনী৷

উপন্যাস যে অর্থে জ্ঞান ও কল্পনা একইসঙ্গে, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর যাকে বলেন অবিদ্যমানের নিঃশ্বাস, বাংলা উপন্যাস সেই এখনো অবিদ্যমান প্রায় জাতীয় আখ্যানের নিঃশ্বাস বয়ে চলেছে৷ তা আরেক অর্থে রিকভারি অব সেলফ, ইতিহাস ও চৈতন্যের বিউপনিবেশীকরণ, অ-বাস্তব থেকে আবার বাস্তব নির্মাণ করা এবং তার সূত্র সন্ধান করা মিথ ও ইতিহাসে৷ বাসনা ও রাজনীতি আকারে উপন্যাসের মুকুরে এই তাগাদা বিরাজমান৷ এবং আবারো বলি, তার উত্স ও বিস্তার নিছক সাহিত্য নয়, তার থেকেও বেশি কিছু, তা হয়তো সেই অবিদ্যমানের নিঃশ্বাসই৷ যে অবিদ্যমান ক্রমশ হয়ে উঠছে৷ এবং তা যদি হয়, তাহলে বলা সম্ভব হবে যে. জাতীয় ইতিহাসের সমান্তরালে সাহিত্যেরও ইতিহাস রচনা সম্ভব৷ এই প্রস্তাব তার ভূমিকা হিসেবে উত্থাপিত হলো৷

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s